দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগাযোগ। দুই দেশের মধ্যে রেল, সড়ক ও আকাশপথে যোগাযোগ বেড়েছে। সে তুলনায় নৌপথ পিছিয়ে আছে। সমুদ্র উপকূলে জাহাজ চলাচলের মাধ্যমে নৌ যোগাযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল অনেক আগে, কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। ভারত লাইন অব ক্রেডিটে যে ৮ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার বাস্তবায়নের গতি শ্লথ। এ বিষয়ে উভয় দিকেই দক্ষতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

বলা বাহুল্য, তা কেবল দুই দেশের যোগাযোগের মধ্যেও সীমিত থাকা উচিত নয়। এই যোগাযোগ হতে হবে বহুমাত্রিক ও বহুপক্ষীয়। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যে উপ-আঞ্চলিক সংযোগ প্রতিষ্ঠা
করার কথা ছিল, তা এখনো কার্যকর হয়নি। কয়েক বছর ধরে সার্ক অকার্যকর হয়ে আছে। অথচ ২০১০ সালের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত আঞ্চলিকতার কথাই জোরালোভাবে
জানান দিয়েছিল। আমরা যদি এই যোগাযোগটা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আসিয়ান পর্যন্ত বিস্তৃত করতে
পারি, তবে বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই লাভবান হবে বলে আমার বিশ্বাস। একটা
সৃজনশীলভাবে উন্মুক্ত আঞ্চলিক যোগাযোগকাঠামো অন্যান্য দেশের জন্যও মডেল হয়ে থাকতে পারে। 

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ ছিল, তা বাংলাদেশ প্রশমিত করেছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ব্যবহার করতে পারছে না। নিরাপত্তার ইস্যুতে ভারতও বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে। তবে বিষয়টি দেখতে হবে সম্পূর্ণ পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতে। এর সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো যাবে না। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা যাতে নিজ নিজ দেশের নিরাপত্তাকৌশলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না করে এবং তৃতীয় দেশের জন্য শঙ্কার কারণ না হয়, সে ব্যাপারেও আমাদের সজাগ থাকতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাও তা–ই। অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা সব দেশের
সহযোগিতা চাই। 

বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের সমস্যাটি বেশ জটিল। চার দশক আগে আমরা যখন কূটনীতিতে প্রবেশ করি, তখন সমস্যা সমাধানে পানি বণ্টনের ওপরই জোর দেওয়া হতো। ২০১০ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ ঘোষণা এবং ২০১১ সালের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোগত চুক্তিতে নদী ব্যবস্থাপনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এর মধ্যে একমাত্র গঙ্গার পানিবণ্টনে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও আমরা তিস্তা চুক্তি করতে পারলাম না ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের কারণে। এটি সম্পর্কের পারস্পরিকতার বিষয়ে যথেষ্ট স্বস্তির বার্তা দেয় না। 

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে। সে ক্ষেত্রে দুই দেশের কৃষি ও শিল্পের জন্য অধিক পানি প্রয়োজন।
আবার কোনো কোনো নদীর উৎস নেপাল, ভুটান ও চীনে; সে ক্ষেত্রে পানি সমস্যার সমাধান কিংবা যৌথ নদী ব্যবস্থাপনায় এসব দেশের সহযোগিতাও প্রয়োজন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে
বিষয়টি ক্রমেই জটিল হচ্ছে, বিশেষ করে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে একে অপরের সমস্যাকে আরও বেশি
গুরুত্ব দিয়ে সৃজনশীলতার পথেই এর সমাধান খুঁজতে হবে। রাজনীতির বাইরে গিয়ে বাস্তবতার আলোকেই সমাধান বের করতে হবে,
যাতে এ অঞ্চলের অধিকসংখ্যক মানুষ
উপকৃত হয়। 

মনে রাখতে হবে আমরা একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান প্রক্রিয়া এতে ইন্ধন জোগাচ্ছে। মিয়ানমারের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এ অঞ্চলে মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা আমাদের ওপর চেপে আছে। নিকট প্রতিবেশী হিসেবে ভারত এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে এবং এ ধরনের প্রক্রিয়া যাতে বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য বিপদের কারণ না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি বলে আমি
মনে করি। 

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বিস্তৃতি ঘটেছে কিন্তু গভীরতা এখনো তেমন পায়নি। দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক মজবুত হয়েছে বলা যাবে না, পরস্পরকে সম্মানজনকভাবে জানা ও গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নানা দ্বিধা ও জটিলতা বিদ্যমান। 

আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভারতে এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বাংলাদেশে বিরূপ প্রভাব না ফেলে সে বিষয়েও উভয়কে সজাগ থাকতে হবে। কেবল দুই দেশের সরকার নয়, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক সুদৃঢ়
করতে পারলেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উপকারের ভিত্তিতে সম্পর্কে টেকসই পর্যায়ে নিয়ে
যাওয়া যাবে। 

লেখক: সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি