আট মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন রাধাবতী দেবী। তাঁর চার বছর বয়সে অন্যত্র বিয়ে করে মা চলে গেলে কাকার পরিবারের সঙ্গে বাবার ভিটাতেই থেকে যান। লেখাপড়া প্রাথমিক পর্যন্ত। ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সে সমবয়সীরা যখন খেলার মাঠে হুল্লোড় করত, রাধাবতী দেবী তখন মণিপুরি তাঁতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ সম্প্রদায়ের অনেক মেয়েই ছোটবেলা থেকে হস্ত ও তাঁতশিল্পের চর্চা করেন। তবে রাধাবতীর প্রশিক্ষণপর্বটা ছিল একটু আলাদা। পার্শ্ববর্তী মঙ্গলপুর গ্রামের থারোঙাউবি দেবীকে তিনি গুরু মানেন। সুতার মাপজোখ থেকে শুরু করে তাঁতে তোলার আগে কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়, সবটাই গুরুমুখী বিদ্যা। ভারতের মণিপুর রাজ্যে গিয়েও নকশা ও বিশেষ ফুল তৈরির কাজ শিখেছেন রাধাবতী। পরে বাড়ি ফিরে শুরু করেন নতুন নকশায় ওড়নার কাজ।

বিছানার চাদর, বালিশের কাভার, মণিপুরি ওড়না—এসবই তৈরি করতেন রাধাবতী। পরে থারোঙাউবি দেবীর হাত ধরে সিলেট যান। একসময় সেখানেই গড়ে তোলেন নিজের কারখানা। ১৯৮৫ সালে গ্রাম থেকে ১০ জন তাঁতি এনে শুরু করেন মণিপুরি কাপড়ের ব্যবসা।

১৯৯২ সালে একবার অসুস্থতার জন্য চিকিৎসক দেখাতে গেছেন রাধাবতী দেবী। সিরিয়াল দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন, সেখানেই ব্যাংক কর্মকর্তা হাজিরা বেগমের সঙ্গে পরিচয়। রাধাবতীর পরনে মণিপুরি ওড়না দেখে হাজিরার কৌতূহল হয়েছিল। হাজিরাই তাঁকে একটা শাড়ি তৈরি করে দেওয়ার ফরমাশ দেন। ৮৫০ টাকা দরে চারটি শাড়ির জন্য অগ্রিম টাকাও দিয়ে দেন তিনি।

এভাবে শুরু হয় ‘মণিপুরি শাড়ি’। একসময় কারখানায় শাড়ি তৈরির ধুম পড়ে যায়। সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে সরকারি বড় কর্মকর্তারা কারখানায় গিয়ে শাড়ির রং নির্ধারণ করে অগ্রিম ফরমাশ দিয়ে যেতেন। একটি খাতায় সেগুলো লেখা থাকত। নির্দিষ্ট রঙের শাড়ির ফরমাশ কমপক্ষে ১০টি হলে শাড়ি তাঁতে তোলার কাজ শুরু করতেন তাঁরা।

ধীরে ধীরে রাধাবতী দেবীর কর্মীরাও শাড়ি বানানোর কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন জেলার তাঁতবস্ত্র মেলাসহ নানা আয়োজনে স্থান পায় ‘মণিপুরি শাড়ি’। সে সময় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে প্রায় ১০ বছর দুপুর ও রাতের খাবার একসঙ্গে খেয়েছেন রাধাবতী দেবী।

২০০৪ সালের দিকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেন রাধাবতী দেবী। সিলেটে নিজে যখন কারখানা চালাতেন, তখন তাঁতিদের মজুরি, ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি নিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। এ ছাড়া অনেকে কাপড় নিয়ে মূল্য পরিশোধ করেননি। অনেকটা অভিমান করেই সিলেট থেকে চলে আসেন তিনি। তবে এরপরও নিজ গ্রামে অনেক নারীকে মণিপুরি শাড়ির কারুকাজ শেখাতেন বিনা মূল্যে। এখনো মণিপুরি–অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। ২০২০ সালে তাঁতজাত বস্ত্রের শ্রেষ্ঠ নকশাকার হিসেবে তাঁকে ‘নকশাকার গুরুমাতা’ উপাধি দেয় বাংলাদেশ মণিপুরি আদিবাসী ফোরাম।

অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, বাজারে শাড়িসহ বিভিন্ন মণিপুরি বস্ত্রের গুণমান নিয়ে এখন অনেক প্রশ্ন। শুধু কাপড়ের আগে ‘মণিপুরি’ নাম যুক্ত করে অনেকে চলছেন। এর মূলে আছে মহাজন, যাঁরা কম দামে ও কম মজুরিতে এসব কাপড় তৈরি করায় এমন বেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

শাড়ি তৈরি না করলেও এখন মণিপুরিদের বিশেষ ওড়না ‘ওয়াংখৈ’ তৈরি করছেন তিনি। এ ছাড়া মণিপুরি তাঁতে কাপড় তৈরিতে কারও কোনো সমস্যা হলে ‘গুরুমাতা’র ডাক পড়ে। খুশিমনেই সবাইকে সাহায্য করেন তিনি।

আগামী প্রজন্মের জন্য কী করে যেতে চান? জানতে চাইলে রাধাবতী বলেন, ‘এখন মেয়েরা পড়ালেখার দিকে মনোনিবেশ করেছেন। কেউ চান না কাপড় বানানো তাঁদের ভবিষ্যৎ হোক। কিন্তু ঐতিহ্য টিকে থাকুক, এটা চাই।’

রাধাবতী দেবী বলেন, রোগী চিকিৎসকের কাছে যাবে অসুখ নিয়ে, চিকিৎসক রোগী খুঁজে বেড়াবে—এমন তিনি চান না। আগ্রহ থাকলে
যে কেউই তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। তিনি প্রস্তুত।

লেখক: প্রথম আলোর সিলেট প্রতিনিধি