২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় ১০টি স্বর্ণ, ২টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জপদক জিতেছেন সান্ত্বনা রানী রায়। লড়াই কি শুধু প্রতিপক্ষেরই সঙ্গেই করতে হয়েছে? রংপুরে কলেজে পড়ার সময় পেটের তাগিদে ঝিয়ের কাজ পর্যন্ত করতে হয়েছে। সেই সান্ত্বনা রায় এখন সিআরআই ইয়াং বাংলার ‘লেটস টক’ অনুষ্ঠানে দেশের নারী খেলোয়াড়দের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা শোনেন, পরামর্শ দেন। 

প্রথম স্বর্ণপদক ঢাকার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ জিমনেসিয়ামে, ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আন্তর্জাতিক আইটিএফ তায়কোয়ান্দো চ্যাম্পিয়নশিপে। দেশের বাইরে প্রথম স্বর্ণপদক এসেছে কাঠমান্ডু থেকে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত এশিয়ান তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায়। তবে এখন পর্যন্ত তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য তায়কোয়ান্দোর দেশ হিসেবে পরিচিত উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত ২০তম বিশ্ব তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জপদক। ২০১৯ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওপেন সাউথ এশিয়ান তায়কোয়ান্দো আইটিএফ প্রতিযোগিতায়ও ব্রোঞ্জপদক পেয়েছেন তিনি। 

লালমনিরহাট তায়কোয়ান্দো অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক হিসেবে সান্ত্বনা রায় সিআরআই ইয়াং বাংলার জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পান ২০১৮ সালে। পুরস্কার নিতে গিয়ে সান্ত্বনা রানী বলেছিলেন, ‘আমি চাই বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আমার মতো সান্ত্বনা তৈরি হোক। সে জন্য লালমনিরহাট তায়কোয়ান্দো অ্যাসোসিয়েশন কাজ করে যাচ্ছে।’ তাঁর সংগ্রামের কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সান্ত্বনাকে ১০ লাখ টাকার একটি পরিবার সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন। 

সান্ত্বনার লালমনিরহাট তায়কোয়ান্দো অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাও এখন সারা দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা থেকে পুরস্কার ছিনিয়ে আনছেন। ২০১৮ সালের ওয়ালটন দশম জাতীয় তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতা থেকে এসেছে একটি স্বর্ণ ও চারটি ব্রোঞ্জপদক। ২০১৯ সালে ১১তম জাতীয় আইটিএফ তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে লালমনিরহাট তায়কোয়ান্দো অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা নিজ নিজ শ্রেণিতে দুটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য ও ছয়টি ব্রোঞ্জপদক লাভ করেন। করোনাকালে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে বড় পরিসরে তায়কোয়ান্দোর আর কোনো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়নি। 

মার্শাল আর্টকন্যা সান্ত্বনা রানী রায় বলেন, ‘আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য উত্তর কোরিয়া এবং পরে বুলগেরিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় আমার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। প্রথম আলোয় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। উত্তর কোরিয়া থেকে ব্রোঞ্জপদক নিয়ে দেশে ফিরি। সেদিন প্রথম আলো পাশে না দাঁড়ালে হয়তো এই অর্জন সম্ভব হতো না।’  

মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ২০১৭ সালে নিজ বাড়িতে হ্যান্ডিক্র্যাফটস নামে একটা উন্নয়ন সংস্থা গড়েছেন সান্ত্বনা। এখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রী ও বিবাহিত নারীদের নানা রকম হাতের কাজ, যেমন নকশিকাঁথা, পুঁতি ও বেত দিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ তৈরি, থ্রি–পিস, ওয়ান পিস, হ্যান্ডপেইন্ট, ইত্যাদি শেখানো হয়। সান্ত্বনা রানী রায়ের নেতৃত্বে প্রায় ৩০০ নারী এখন এসব হাতের কাজ শিখছেন। 

সান্ত্বনার হাত ধরেই বদলে গেছে লালমনিরহাটের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অনেক মানুষের জীবন। একসময় যে তায়কোয়ান্দোর নামই জানত না অনেক মানুষ, সেখানে এখন নারী-শিশুরাও তায়কোয়ান্দো শিখছে। তায়কোয়ান্দোর পোশাক পরে শিশুরা যখন গ্রামের পথ ধরে সাইকেল চালিয়ে যায়, অবাক হয়ে দেখে সবাই। 

যারা তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করেছিল, তারাই এখন সান্ত্বনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলে, জানালেন সান্ত্বনার মা যমুনা রানী রায়। 

লেখক: প্রথম আলোর লালমনিরহাট প্রতিনিধি