১. জামদানি

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) পক্ষ থেকে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের অনুমোদন চাওয়া হয়। ২০১৬ সালে সেটি স্বীকৃতি পায়। 

জামদানি শাড়ি হলো কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত করা একধরনের বস্ত্র। একে মসলিনের উত্তরাধিকারীও বলা যায়। এই শাড়ি ও কাপড় কয়েক হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্য। 

নারায়ণগঞ্জের পাশে শীতলক্ষ্যা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়া ও পরিবেশ জামদানি বোনার জন্য উপযোগী। শীতলক্ষ্যার পানির সঙ্গে রং মিশিয়ে রঙিন করা হয় সুতা। অন্য কোনো এলাকার পানি দিয়ে সুতার ওই স্থায়িত্ব ও রং আনা সম্ভব না। জামদানির আরেকটি প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে এটি সম্পূর্ণ হাতে বোনা হয়ে থাকে। ওই কাপড় বোনার জন্য বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কারিগরের দরকার হয়, যাঁরা মূলত শীতলক্ষ্যার তীরে বসবাস করে থাকেন। ঢাকার নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে জামদানি তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি।

বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে বেনারসিপল্লির পাশে জামদানিপল্লি আছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে ১৯৯৩ সালে  বিসিকের তত্ত্বাবধানে ২০ একর জমির ওপর জামদানি নগর তোলা হয়েছে।

২. ইলিশ

২০১৭ সালে ইলিশ মাছের জিআই স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর।  আবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই বছরের জুনে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু দুই মাসের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কোনো আপত্তি না করায় এ পণ্যের জিআই স্বত্ব পায় বাংলাদেশ।

মৎস্যসম্পদবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। ইলিশ আছে, বিশ্বের এমন ১১টি দেশের ১০টিতেই মাছটির উৎপাদন কমছে। একমাত্র বাংলাদেশেই বাড়ছে। গত এক যুগে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। দেশে গত ছয় বছরে ইলিশের ওজন গড়ে ৬০০ থেকে বেড়ে ৯০০ গ্রাম হয়েছে। ঠিকমতো পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ নিলে সাড়ে সাত লাখ টন ইলিশ উৎপাদন করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত মাছের ১০ শতাংশই ইলিশ। বাংলাদেশের জিডিপির ১ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে।

পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদী, শাখা, উপশাখা, মোহনা ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশ বিচরণ করে। এর মধ্যে পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। 

৩. বাগদা চিংড়ি

বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আবেদনের পর ২০২১ সালে জিআই স্বীকৃতি পায় বাগদা চিংড়ি। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উপকূলীয় সমুদ্র এলাকা বাগদা চিংড়ির আদিভূমি। বাঘের মতো শরীরে ডোরাকাটা থাকে বলে একে ব্ল্যাক টাইগার চিংড়িও বলা হয়ে থাকে। 

৪. চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আম

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাতি আমকে জিআই স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য নিবন্ধনের আবেদন করেছিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। সেটা স্বীকৃতি পায় ২০১৯ সালে।

গোল ও মাঝারি আকৃতির রসাল আমটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশহীন, গন্ধ বেশ আকর্ষণীয় এবং স্বাদে খুব মিষ্টি। ফলের খোসা সামান্য মোটা, তবে আঁটি পাতলা। এ কারণে আমটির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাওয়া যায়। সাধারণত জুন মাসের শুরু থেকে আম পাকা শুরু করে। এই আমের ফুল আসা থেকে ফল পরিপক্ব হতে দরকার হয় চার মাস।

৫. ফজলি আম

বাংলাদেশে উৎপন্ন আমের মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির আম হচ্ছে ফজলি। ফল গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে এটি জিআই নিবন্ধন পায়। এই আম লম্বায় ১২ ও প্রস্থে ৫ সেন্টিমিটারের বেশি থাকে।  

৬. ঢাকাই মসলিন

মসলিনের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। একসময় এটিই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি কাপড়। বলা হয়ে থাকে, মসলিন শাড়ির বুনন এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে পুরো একটি শাড়ি আংটির ভেতর দিয়ে এপার-ওপার করা যেত। প্রাচীন আমলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহ-সম্রাট থেকে শুরু করে ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ওই কাপড় পরতেন। মিসরে মমি করা শরীর ঢাকাই মসলিনে আবৃত করা হতো।

সতেরো শতকে মোগল আমলে এই কাপড়ের উৎপাদন ব্যাপক বিকাশ লাভ করে। আর লন্ডনে, ১৮৫০ সালে হয়েছিল ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী। প্রচলিত আছে, শিল্পীদের আঙুল কেটে দেওয়ার পরে ঢাকাই মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। 

২০২১ সালে সেই আদি মসলিন বাংলাদেশে আবারও উৎপাদিত হয়েছে। যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে এসেও এই শাড়ি তৈরিতে তাঁতিদের হাতে কাটা ৫০০ কাউন্টের সুতাই ব্যবহার করতে হয়েছে। কাপড়ও বোনা হয়েছে হস্তচালিত তাঁতে। ভারতেও এখন মসলিন তৈরি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাই মসলিনের বিশেষত্বই আলাদা।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড (বাতাঁবো) ঢাকাই মসলিনকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করার জন্য ডিপিডিটির কাছে আবেদন করলে সেটি ২০২০ সালে স্বীকৃতি পায়। সংস্থাটি জানায়, তারা ছাড়া প্রকৃত মসলিন কাপড় বর্তমানে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে না।

৭. রাজশাহী সিল্ক

রাজশাহী সিল্ককে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য ২০১৭ সালে আবেদন করে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড। ২০২২ সালে মিলেছে স্বীকৃতি। রেশম কাপড়ের একটি ধরন এই রাজশাহী সিল্ক। এটি মালবেরি সিল্ক।

মালবেরির বাংলা হলো তুঁতগাছ। ২০-২২ দিন এই গাছের পাতা খাওয়ার পর রেশম পোকার মুখ থেকে যে লালা নিঃসৃত হয়, সেটা থেকেই তৈরি হয় রেশম গুটি। এই গুটি থেকে রিলিং মেশিনের মাধ্যমে সুতা বা কাঁচা রেশম উত্তোলন করা হয়। সেই কাঁচা রেশমকে বিভিন্ন উপায়ে প্রক্রিয়া করে তাঁত মেশিনে বুনে তৈরি করা হয় রাজশাহী সিল্ক। কাপড় বোনার পর বিভিন্ন রং দিয়ে ডাইং ও প্রিন্টিং করা হয়। অনেক সময় কাপড় বোনার আগে সুতা রং করা হয়ে থাকে। এ কারণে রাজশাহী সিল্ক দেখতে বেশ উজ্জ্বল ও চকচকে।

মো. আব্দুর রশীদ খানের বাংলাদেশের ঐতিহ্য রাজশাহী অনুযায়ী ১৭৫৯ বা তার আগে থেকেই রাজশাহীতে রেশম পোকার উৎপাদন ও এর কাপড় ব্যবহার হয়ে আসছে। রাজশাহীর বোয়ালিয়া বন্দরে এই রেশমের চাষ হতো সবচেয়ে বেশি। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রাজশাহী সিল্ক রপ্তানি হতো। এখন নতুন করে রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

৮. রংপুরের শতরঞ্জি

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০১৯ সালে ডিপডিটির কাছে রংপুরের শতরঞ্জির জিআই স্বীকৃতির আবেদন করেছিল। ২০২২ সালে আসে স্বীকৃতি।

রংপুরের ঘাঘট নদের তীরে তৈরি হতো এই শতরঞ্জি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতেও এ এলাকায় শতরঞ্জির প্রচলন ছিল। মাটির ওপর সুতা টানা দিয়ে বাঁশ এবং রশির ওপর হাতে নকশা করে তৈরি হতো শতরঞ্জি। এ অঞ্চলের শতরঞ্জির প্রসারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইংরেজ কালেক্টর নিসবেটের নাম। ১৮৪০ সালের দিকে তৎকালীন রংপুর জেলার কালেক্টর ছিলেন নিসবেট। পীরপুর গ্রামে সে সময় রং-বেরঙের সুতার গালিচা বা শতরঞ্জি তৈরি করা হতো। শতরঞ্জি দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং এ শিল্পের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে সহায়তা দেন এবং বিপণনের ব্যবস্থা করেন। এই ভূমিকার জন্যই নিসবেটের নামানুসারে পীরপুরের নাম হয় নিসবেতগঞ্জ।

ব্রিটিশ শাসনামলে শতরঞ্জি এত বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে যে এখানকার তৈরি শতরঞ্জি সমগ্র ভারতবর্ষ, বার্মা, সিংহল, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো।  

১৯৭৬ সালে বিসিক নিসবেতগঞ্জ গ্রামে শতরঞ্জি তৈরির একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে ১৯৯৪ সালে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে ওই এলাকার মানুষদের শতরঞ্জি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করে। সেই থেকে রংপুরের শতরঞ্জি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় ৩৬টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

৯. কালিজিরা ধান

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এই পণ্যকে জিআই হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন জানিয়েছিল, যা স্বীকৃতি পেয়েছে ২০২১ সালে। কালিজিরা ধানের খোসা কালচে হলেও চালের রং সাদা। এই জাতের ধানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি খুব ছোট এবং সুগন্ধিযুক্ত। দানার আকৃতি ছোট আবার খোসা কালো হওয়ার কারণে একে দেখতে অনেকটা কালিজিরা মসলার মতো মনে হয়। তাই এমন নাম। এই চাল দিয়ে মূলত ভাত, পোলাও, পায়েস বা ফিরনি তৈরি করা হয়।

এই ধানের উৎপত্তিস্থল ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলে। তবে স্বাদ ও সুগন্ধির কারণে ওই চাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তা সারা দেশে চাষ হয়। সাধারণত শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাস অর্থাৎ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে কালিজিরার চারা রোপণ করতে হয়। আর ১০ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ফসল কাটা হয়।

১০. দিনাজপুরের কাটারিভোগ

দিনাজপুরের কাটারিভোগ ধান জিআই হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন জানিয়েছিল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই বছর পাওয়া গেছে স্বীকৃতি। কালিজিরার মতো এই ধানের বৈশিষ্ট্য হলো এ থেকে উৎপাদিত চাল সরু ও সুগন্ধি। এটি সারা বাংলাদেশে উৎপাদিত হলেও সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয় ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মাগুরা ও সিলেট জেলায়।

তবে এই ধানের মূল উৎপত্তিস্থল দিনাজপুরে। দিনাজপুর ছাড়া অন্য এলাকায় চাষ হলে সুগন্ধ কমে যায়। দিনাজপুরে উৎপাদিত আমন ধানের মধ্যে কাটারিভোগ অন্যতম।এ  কারণে দিনাজপুরের কাটারিভোগ পণ্যটিকেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

চাষাবাদের অনুকূল পরিবেশ থাকায় দিনাজপুরে প্রাচীনকাল থেকেই কাটারিভোগ চাষাবাদ হয়ে আসছে।  শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাস অর্থাৎ আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে চারা রোপণ করতে হয়। ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে ফসল কাটা হয়।

১১. বিজয়পুরের সাদা মাটি

নেত্রকোনার এই প্রাকৃতিক সম্পদকে জিআই স্বীকৃতি দিতে নিবন্ধনের আবেদন করেছিল নেত্রকোনা জেলা প্রশাসনের কার্যালয়, যা ২০২১ সালে এসে স্বীকৃতি পায়। সিরামিকের বাসনকোসন, টাইলস, গ্লাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে এই উৎকৃষ্ট মানের সাদামাটি। নেত্রকোনা জেলার বিজয়পুরে সাদা মাটির বিপুল মজুত আছে।

এই মাটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রাকৃতিকভাবেই কেওলিন বা অ্যালুমিনিয়ামসমৃদ্ধ। সেই সঙ্গে সিলিকা বালুসহ আরও অনেক খনিজ পদার্থ রয়েছে। স্থানভেদে মাটির বৈশিষ্ট্য ও মান ভিন্ন ভিন্ন হয়। কালো, ধূসর ও লাল রঙের এই মাটি শুকনো অবস্থায় মধ্যম মাত্রার শক্ত ও ভঙ্গুর হয়। ভেজা অবস্থায় এই মাটি বেশ মসৃণ, নরম ও আঠালো।

ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ১৯৫৭ সালে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার দুর্গাপুর থানায় ভেদিকুরায় প্রথম সাদা মাটির সন্ধান পায়। দুর্গাপুর বর্তমানে নেত্রকোনার একটি উপজেলা। উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর ওপারেই সাদা মাটির পাহাড়ের অবস্থান। সেখানে ১৬৩টি সাদা মাটির টিলা রয়েছে।

লেখক:প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি