মোটের ওপর তিনি যা বললেন, তা হলো তাঁর বাবা স্বর্ণের ব্যবসা করতেন। একেক দিন একেক মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। কোনো কিছু পরোয়া করতেন না।

একপর্যায়ে পরিবারের পছন্দে বিয়ে করেন। সংসারটা টেকেনি। পরে ভালোবেসে চেনাজানা আরেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। ওই সংসারে বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বামী পিতৃত্ব স্বীকার করতে চাইছেন না।

ছোট্ট সন্তানটিকে নিয়ে এসেছিলেন ওই নারী। বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। আবারও বললেন, ‘আমি একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে।’ এই নারীর জীবনের এমন তরঙ্গবহুল ঘটনা আমি ছাড়া আর শুনেছিল বোর্ডরুম। শুধু কি এই ঘটনা? এমন শত শত হাসিকান্নার সাক্ষী হয়ে আছে প্রথম আলোর বোর্ডরুম। পুলিশি হয়রানি, সুচিকিৎসা বা ন্যায়বিচার না পাওয়া, সুশাসনের সংকট, দারুণ কোনো আবিষ্কার বা শুধু দুটো কথা বলতে কত মানুষ যে এসেছেন!

লিখতে গিয়ে কারও কারও মুখটা ভেসে উঠছে চোখে। এমন তো হয়, কোনো একটা ঘটনার পেছনে ছুটতে ছুটতে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষটাও আত্মীয় হয়ে ওঠেন।

তেমন একজনের কথা মনে পড়ে প্রায়ই। ভদ্রলোককে আমি আঙ্কেল বলে ডাকি। তিনি চিকিৎসক ইকবাল মাহমুদের বাবা। ২০১৬ সালের শেষের দিকের ঘটনা। ইকবাল লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকায় আসছিলেন, সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে বাস থেকে নামার পরপরই একদল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।

আঙ্কেল মুক্তিযোদ্ধা। কৃশকায় একজন মানুষ, মুখে সফেদ দাড়ি। ছেলে অপহরণের পর আবারও যুদ্ধে নেমেছেন। পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে ছোটাছুটি, একের পর এক সংবাদ সম্মেলন—কী করেননি!

এক শীতের বিকেলে ওই আঙ্কেল এসেছিলেন অফিসে। আমরা বোর্ডরুমে বসেছিলাম। কফির মগটা বাড়িয়ে দিতে গিয়ে খেয়াল করলাম, আঙ্কেলের হাতটা তির তির করে কাঁপছে। কষ্ট হচ্ছে কথা বলতেও। ছেলের খোঁজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত। বুঝতে পারছিলাম, বিশেষ কোনো আবদার নিয়ে তিনি আসেননি, এসেছেন দুটো কথা বলে স্বস্তি খুঁজতে।

চিকিৎসক ইকবালকে কয়েক মাস পর পাওয়া গিয়েছিল। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রথম আলো অফিসেও এসেছিলেন তিনি। বোর্ডরুমে সেদিন চাঁদের হাট।

কোনো এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে একজন অতিথি বলেছিলেন (নাম মনে করতে পারছি না), যাঁদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, কথা বলার সুযোগ নেই, সংবাদপত্র হলো তাঁদের কথা শোনার জায়গা। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি যে সমস্যাটি নিয়ে এসেছেন, সেটি প্রথম পাতায় ছাপার উপযোগী। আমরা হয়তো বুঝি, খবরটা আসলে ছাপার মতো নয়। প্রাসঙ্গিক দুয়েকটা পরামর্শ দিই তাঁদের। চা বা কফি খাওয়াই।

তবে, এই সতেরো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমার উপলব্ধি, প্রচুর মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু চান তাঁর হাজারো না পাওয়া জীবনের গল্পটা মমতা দিয়ে কেউ শুনুক। সেই কাজটাই আমরা করে যাওয়ার চেষ্টা করি। শুনে যাই, মানুষের পাওয়া-না পাওয়ার গল্প। আমাদের পাশাপাশি, চুপচাপ বোবা বোর্ডরুমও শুনে যায় সব। সেও কি কাঁদে? হাসে?

লেখক: প্রথম আলো পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদক