তখন আইসিএবি ভবনে অফিস করি। আমাদের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন হয় ভবনের পঞ্চম তলায়। গোলটেবিল আয়োজনের অতিথিদের নেমপ্লেট করা, স্বাগত জানানো, খাবার ব্যবস্থাপনা, অনুষ্ঠান রেকর্ডিং, উপহার বিতরণ, অতিথিদের গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থাপনা, গাড়িচালকদের খাবার বিতরণ ইত্যাদি কাজে প্রশাসন বিভাগ সরাসরি যুক্ত থাকে। যোগদানের সপ্তাহখানেক পরই একটা গোলটেবিল আয়োজনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাই। উক্ত কাজগুলোর সবকিছু গুছিয়ে ফেলি, সব ঠিকমতোই চলছে। দুপুর ১২টা হবে, সভাকক্ষের লাগোয়া ছোট্ট আপ্যায়নকক্ষে আমাদের নুরু ভাই (নুরুল হক হাওলাদার), মৃধা ভাইসহ (আনোয়ার হোসেন মৃধা) পরিকল্পনা করছি, খাবার পরিবেশনা কেমন হবে। হঠাৎ মাঝখানের গ্লাস ডোর ঠেলে সম্পাদক মতিউর রহমান (যাঁকে আমরা কেউ মতি ভাই বা স্যার ডাকি) ভেতরে আসেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘ড্রাইভারদের খাবারের ব্যবস্থা করেছ?’
: জি, স্যার। কাচ্চি বিরিয়ানির ব্যবস্থা করেছি।
: ভালো করেছ। এক্ষুনি দিয়ে দাও।
: জি, স্যার।

সম্পাদক স্যার চলে যাচ্ছেন। আমি নুরু ভাইকে বললাম, ‘নুরু ভাই, আপনি খাবারগুলো নিয়ে পার্কিংয়ে যান। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপককে বলা আছে, তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করবে।’
স্যার আবার ফেরত আসেন, আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মাতব্বর হয়ে গেছো? আমাকে দাও, আমি বিতরণ করব।’ এ বলেই নুরু ভাইয়ের হাত থেকে আনুমানিক দশ-বারোটি খাবার প্যাকেট নিয়ে লিফটের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। মুহূর্ত খানেক পর আমার সম্বিৎ ফিরে, স্যারের পেছনে দৌড়াই। লিফটের সামনে পৌঁছে স্যারের হাত থেকে খাবার প্যাকেটগুলো হাতে নেই। স্যার আবার সভাকক্ষে চলে যান।

মন খারাপ নিয়ে পার্কিংয়ে খাবার বিতরণ করি। এমবিএ পাশ করে এসে গাড়িচালকদের খাবার বিতরণ করি—এ ধরনের বালখিল্য ভাবনা আমাকে পীড়া দেয়। পাঁচতলায় আসি, মুখে মন খারাপের ছায়া। দেখি, গোলটেবিল আলোচনার অতিথি ড. আনিসুজ্জামান দারুণ আনন্দ নিয়ে গল্প করছেন আর সম্পাদক স্যার ড. আনিসুজ্জামানের পানির বোতলের মুখ খুলে গ্লাসে পানি ঢেলে দিচ্ছেন। এ এক মন ভালো করা দৃশ্য! আমি ভারমুক্ত হই, মন খারাপের স্থলে বিস্ময় আর মুগ্ধতা ভর করে।

আয়োজন শেষ হয়, সবাই চলে যান সভাকক্ষ ছেড়ে। সম্পাদক স্যার আমাকে ডাকেন, কাছে যাই। জিজ্ঞেস করেন,
: খেয়েছ?
: এখনও খাইনি। খাবো একটু পর।
: কী মিয়া! মন খারাপ?
: কিছুটা খারাপ লেগেছিল। এখন ভালো হয়ে গেছে, স্যার।

আমাকে পাশে বসতে বলেন, বসি। নুরু ভাইকে বলেন দুজনের খাবার পরিবেশন করতে। খাবার পরিবেশিত হয়, আমরা খেতে থাকি। খাওয়ার ফাঁকে আদরমাখা কণ্ঠে ড. জামিলুর রেজা স্যারের বিনয়ের গল্প করেন। একটা কথা হৃদয়ে গেঁথে যায়, কানে বাজতে থাকে, ‘বুঝলে কবীর, গাছ বড় হলে নিচের দিকে নুয়ে পড়ে। আর মানুষ যত বড় হয়, তত বিনয়ী হয়, অন্যকে তত বেশি সম্মান করে।’

ওই দিনের পর থেকে এখন পর্যন্ত মানুষ হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

লেখক: ব্যবস্থাপক, প্রশাসন