একেক রোগীর চিকিৎসার মান একেক ধরনের হওয়ায় স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সেবার ফলকে তা প্রভাবিত করছে। চিকিৎসার গুণমান খারাপ হওয়ার পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা অথবা প্রয়োজনের তুলনায় কম চিকিৎসা পাওয়ার বিষয়টি কাজ করে থাকে। এর ফলে রোগীর স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে, অসুস্থতার সময় দীর্ঘ হয় এবং মাঝেমধ্যে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে এ দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব সময় কর্মস্থলে পাওয়া যায় না, তাঁদের দক্ষতার বিষয়ে মানুষের আস্থার এবং রোগীর প্রতি তাঁদের সহানুভূতির ঘাটতি আছে। সেই বিবেচনায় চিকিৎসকদের পরিষেবা দেওয়ার মান খারাপ। সেবা-পরিচর্যার নিম্নমানের আরেকটি প্রধান কারণ যোগ্য ও দক্ষ সহায়ক কর্মীর (নার্স, চিকিৎসা সহকারী, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান) অপ্রতুলতা। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা বেতনও খুব কম পান।

জনমনে ধারণা আছে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সেবার মান ভালো। সেই ধারণা থেকে প্রায়ই রোগী ও তাঁর পরিবার এসব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে থাকে।

সেবা ও পরিচর্যার নিম্নমান শুধু স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে না, বরং ভিন্ন ভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা রোগীদের বিভ্রান্ত করে এবং তাতে তাঁদের স্বাস্থ্যসেবা নিতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেই খরচের সিংহভাগই রোগী বা পরিবারের সদস্যদের নিজেদের পকেটের অর্থে পরিশোধ করতে হয়, যাকে ‘আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার’ (ওওপিই) বলা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ হলো এই ওওপিই, যা বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। রোগীর চিকিৎসায় ১০০ টাকা খরচ হলে রোগীকে বা তাঁর স্বজনকে ওওপিই হিসেবে ৬৮ দশমিক ৫ টাকা ব্যয় করতে হয় এবং সরকার বাকি ৩১ দশমিক ৫ টাকা ব্যয় করে। বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রতিবছর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসে।

দরিদ্র পরিবারগুলোকে উচ্চমাত্রার ওওপিইর ধাক্কায় তাৎক্ষণিকভাবে বিপর্যস্ত হতে দেখা গেলেও এর প্রভাব আর্থসামাজিক স্তরের পুরো জনসংখ্যাকে গ্রাস করে। এই বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় মূলত হয় দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগের ওষুধের খরচ জোগাতে গিয়ে কিংবা বিপর্যয়কর কোনো স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণে। হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে নামের একটি জরিপের পারিবারিক আয় ও ব্যয়সংক্রান্ত সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু ওষুধ বাবদই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ ওওপিইর আশঙ্কা থাকে। এটি বাংলাদেশি স্বাস্থ্যসেবা খাতের মূল্য ও মানের ভারসাম্যহীনতাকে নির্দেশ করে।

সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অর্ধেকের বেশি রোগীর ক্ষেত্রে আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা খরচ মেটাতে দুর্দশার মধ্যে পড়তে হয়, যা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে খরচ জোগাতে বিপর্যয়ে পড়া লোকের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। এটি দরিদ্রতম পরিবারগুলোকে স্বাস্থ্যসেবা খরচের মাধ্যমেই স্বাস্থ্যগত বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতে পারে। কারণ, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের ধার করতে হয় কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে হয়।

সেবার নিম্নমান তথা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং অপ্রতুল চিকিৎসা উভয়ই ওওপিইতে উল্লেখযোগ্যভাবে ভূমিকা রাখে, যা বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। নিজের পকেটের পয়সা খরচ বা বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়—এই দুই সমস্যার মূল কারণ হলো এমন একটি সুসংহত এবং পদ্ধতিগত ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, যা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা জারি রাখে ও দৃঢ় জবাবদিহি নিশ্চিত করে।

দুর্ভাগ্যবশত, রাজনৈতিক লোকজন ও নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থকেন্দ্রিক অ্যাজেন্ডা আমাদের স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের প্রধান চালিকা শক্তি এবং তাদের এই ধরনের কাজকারবারে নৈতিকতা বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করতে এবং ওওপিই কমাতে বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিকতাভিত্তিক রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন দরকার।

লেখক: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যক–জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও সহযোগী ডিন