সেই জজ মিয়া ‘তারকা সন্ত্রাসী’!

প্রথম আলো ২৫ বছর ধরে অসংখ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছেপেছে। পেয়েছে অগণিত পাঠকের অকুণ্ঠ প্রশংসা। এর অনেক প্রতিবেদন দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচন করেছে। আবার মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে কোনো কোনোটি। এমন একটি প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ তুলে আনা হলো এখানে।

গ্রেনেড কী জিনিস, জীবনেও দেখেননি জজ মিয়া। মাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে গিয়ে নিজেই বলেছেন, বোমা ও গ্রেনেডের পার্থক্য তিনি জানেন না। থানা-পুলিশ বলেছে, জজ মিয়া নিরপরাধ মানুষ, তাঁর নামে থানায় কোনো মামলা নেই। সেই জজ মিয়া ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দেওয়ার সুবাদে রীতিমতো তারকা সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়েছেন।

সিআইডির তৎকালীন বিশেষ সুপার রুহুল আমিন বলেছেন, জজ মিয়াকে ইন্টারপোল কর্মকর্তাদের সামনে হাজির করা হলে তাঁরা তাঁর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হন। এরপরই তাঁর জবানবন্দি নেওয়া হয়। তবে ইন্টারপোল কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

প্রথম আলোর সেনবাগ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি মাহবুবুর রহমান জানান, সেনবাগে জজ মিয়ার গ্রামের লোকজন বিশ্বাসই করতে পারছেন না, তাঁর মতো সহজ-সরল যুবক গ্রেনেড হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজেমুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, জজ মিয়ার নামে থানায় কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। তিনি নিরপরাধ মানুষ।

বীরকোট গ্রামের ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন জানান, জজ মিয়ারা সাত-আট বছর আগে সপরিবার গ্রামের বাড়িতে আসেন। কখনো কারও সঙ্গে তাঁর ঝগড়া-বিবাদ হয়নি। কেশারফা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুবকর ভুঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, জজ মিয়া সন্ত্রাসী ছিলেন না। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু ইউসুফ মজুমদারও একই কথা বলেন।

সেনবাগ উপজেলার বোকারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের মৃত আবদুর রশিদের দ্বিতীয় সংসারের ছেলে জজ মিয়ার জন্ম ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া এলাকায়। বাবার ভাঙারি (স্ক্র্যাপ মালের) ব্যবসার সুবাদে তাঁদের পরিবারের সবাই প্রথমে সেখানকার তিব্বত বস্তি এবং পরে নাখালপাড়া নূরানী মসজিদের পাশে থাকতেন। নাখালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন জজ। পরে তাঁকে স্থানীয় মনু মিয়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। 

২০০৫ সালের ৯ জুন জজ মিয়াকে আটক করে সেনবাগ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আবদুর রশিদ। ২১ দিন রিমান্ডসহ মোট ২৭ দিন সিআইডি কার্যালয়ে তাঁকে রাখা হয় তদন্ত কর্মকর্তার কক্ষে। তাঁর জন্য নতুন লেপ-তোশক ও বালিশ কেনা হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়। জজ মিয়ার বক্তব্য, ২৭ দিন ধরে তাঁকে মূলত ভয় দেখানো এবং জবানবন্দি মুখস্থ করানো হয়। কয়েক দিন পরপর এসপি রুহুল আমিনের কক্ষে পরীক্ষা নেওয়া হতো, জবানবন্দি ঠিকভাবে মুখস্থ হয়েছে কি না, তা দেখতে।

জজ মিয়া জানান, চাপের মুখে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনিই তুলে ধরেন প্রকৃত সত্য। বিনা অপরাধে পাঁচ বছর কারাভোগ করার পর এখন তিনি মুক্ত। জজ মিয়া এখন নারায়ণগঞ্জে ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালান।

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০০৫