মূলত লুণ্ঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে গিয়ে আজকের এ পরিস্থিতি। আমরা এ–ও দেখি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা ও অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৮ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বিইআরসির অনুমোদিত মুনাফা হচ্ছে ৫ শতাংশের নিচে। ইকুইটি মানির ওপরেও মুনাফা দেওয়া হয়েছে। এভাবে বিনিয়োগকারীকে অতিরিক্ত মুনাফা প্রদান ও প্রতিযোগিতাহীন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং কারিগরি সক্ষমতাহীন উদ্যোক্তাদের সুযোগ করে দিয়ে একটি প্রহসনমূলক অবস্থা তৈরি করা হয়। গোটা খাত যেভাবে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে, তাতে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানির দরপতন ঘটলেও সংকট থেকেই যাবে।

 এখন উত্তরণ কীভাবে হবে। প্রথমত, সরকারের রাজস্ব আহরণের উৎস হিসেবে এ খাত বিবেচনা করা যাবে না। এ খাতে যা খরচ হবে, তা সরকার জনগণের কাছ থেকে উশুল করবে। এ খাত থেকে সরকার যে অতিরিক্ত মুনাফা ও নানাবিধ কর আদায় করছে, সেটিও যৌক্তিকভাবে সমন্বয় করতে হবে। এতে হয়তো সরকারের মুনাফা কমবে, কিন্তু সরকারের ঘাটতি বা ভর্তুকি দেওয়া কমে যাবে।

এ খাত অবশ্যই সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ব্যক্তি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে, সঞ্চালন লাইন নিয়েও তেমন শুরু হয়েছে। সরকারের বড় কর্তারা এসব কোম্পানি ও বেসরকারি খাতের সুবিধাভোগী। কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার জন্য তাঁরা জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছেন।

বিদ্যুৎ খাতে যে সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কথা বলা হচ্ছে, তা এভাবে ডেকে আনা হয়েছে। কোম্পানি বানিয়ে সেখানকার বোর্ডের সভাপতি ও অন্যান্য পদে সরকারি কর্মকর্তাদের বসিয়ে তাঁদের হাতে মালিকানা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা যে যেভাবে খুশি কোম্পানির লাভের টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। এগুলো বন্ধ করতে হবে। আইন লঙ্ঘন করে বিইআরসির ক্ষমতা আটকে রেখে মন্ত্রণালয় যেভাবে লাইসেন্স দিচ্ছে, সেখান থেকে সরে আসতে হবে।

এসব বোর্ডের মাধ্যমে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগকে সরে আসতে হবে। সেসব জায়গায় ব্যত্যয় ঘটলে স্বার্থসংশ্লিষ্টহীনভাবে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া তাঁদের দায়িত্ব। তা পালন না করে তাঁরা হয়ে গেছেন কোম্পানিগুলোর রক্ষাকারী। তাহলে কী করে বলা যায়, এ খাত কোনো দিন সংকটমুক্ত হবে? সেখানে একেকজন কর্মকর্তা কে কখন বিদেশ সফরে যাবেন, তার জন্য বসে থাকেন। সেই সফরের খরচ কোন কোম্পানি দেবে, সেগুলোও সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈঠকে পাস হয়।

বড়পুকুরিয়ায় কয়লা তোলার সক্ষমতা না থাকলেও সেখানকার কোম্পানিকে শতভাগ ঝুঁকি ভাতা দেওয়া হয়। আমাদের কয়লা আমরা উত্তোলন করব, তাতে দাম হওয়ার কথা ৬০–৭০ ডলার, কিন্তু এমন প্রক্রিয়া করা হয়েছে, যা কিনতে হচ্ছে প্রায় ১৫০ ডলারে। গণশুনানি সূত্রে জানা যায়, পায়রা তখন বাইরে থেকে আমদানি করেছে ১০০ ডলারে। এটি কি প্রক্রিয়া করে আর্থিক লোপাট নয়? অন্যদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু কয়লা সরবরাহ বাড়েনি। একইভাবে পায়রার চাহিদা না থাকায় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। তাহলে এত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হলো কেন? বলা যায়, এ খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে কিছু কর্মকর্তার হাতে। তাঁদের অসম্ভব ক্ষমতাশালী করে দেওয়া হয়েছে।

এখন আমরা সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা ঘোষণা করেছি। সেগুলো সরকারকে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সামনে যে সংকট আসছে, তা সবাই মিলে মোকাবিলা করতে হবে। আমি মনে করি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত যে সংকটে আছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সহযোগিতা ও সংস্কারমূলক উদ্যোগের দিকে যেতে হবে।

ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা