প্রথম আলোতে আমাকেই একদিন সংবাদ প্রকাশ নিয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল। অন্য পত্রিকায় কাজ করার সময় এ কাজটি যদিও আমাকে অনেকবারই করতে হয়েছে।

প্রথম আলোতে আমি যুক্ত হই ২০০৪ সালের এপ্রিলে। এসেই দেখলাম, এটাই তো আমাদের সেই স্বপ্নের পত্রিকা, যেখানে সম্পাদকই মুখ্য। পত্রিকার বিষয়বস্তু ঠিক করছেন পেশাগত সাংবাদিকেরাই। এখানে মালিকেরা মূলত কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন আসেন, সবার সঙ্গে সময় কাটান, কিছু কথাবার্তা বলেন। সংবাদ কী যাবে বা যাবে না—এ বিষয়ে তাঁরা কোনো কথাই বলতেন না।

তারপরও প্রথম আলোতে আমাকেই একদিন সংবাদ প্রকাশ নিয়ে মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল। অন্য পত্রিকায় কাজ করার সময় এ কাজটি যদিও আমাকে অনেকবারই করতে হয়েছে। সেসব ঘটনা অন্য কোনো দিন লেখা যাবে। আজ বরং প্রথম আলোর কথাটাই বলি। মুখে মুখে এর আগে ঘটনাটি আমি বলেছি। কিন্তু কখনো লেখা হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, লিখে রাখা দরকার। কারণ, ঘটনাটি আসলে ইতিহাসেরই উপাদান। ভবিষ্যতে যাঁরা বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস লিখবেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে গবেষণা করবেন, তাঁদের জন্যই তা লেখা দরকার বলে মনে হচ্ছে।

আসলে শেষ বিচারে স্বাধীন সংবাদপত্রই টিকে থাকে। স্বাধীনতার চর্চা ভেতর থেকেও করতে হয়।

তখন ক্ষমতায় সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সে সময় মূলত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গুরুতর অপরাধ ও দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি নামে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। কমিটি সন্দেহভাজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রকাশ করত। দিনটি ছিল ২০০৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। ওই দিন কমিটি তৃতীয় তালিকাটি প্রকাশ করে। ৮০ জনের তালিকায় ছিলেন রাজনীতিবিদ, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও নেতা ও ব্যবসায়ীরা। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, তালিকায় আছে প্রথম আলোর উদ্যোক্তা, ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাম। যদিও লতিফুর রহমানের স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তবে তালিকাটি ছিল সেদিনের জন্য অন্যতম আলোচিত সংবাদ।

তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। নিউজটা আমিই লিখছিলাম। সম্পাদক মতি ভাই বললেন, তালিকায় নাম থাকার ব্যাপারটা আমিই যেন জনাব লতিফুর রহমানকে ফোন করে জানাই। নিউজ নিয়ে মালিকপক্ষকে সেবার ফোন করাটাই ছিল প্রথম আলোয় আমার প্রথম ও শেষ ঘটনা। ফোন করে প্রথমে ঘটনাটি জানালাম। তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, আগে প্রকাশিত দুই তালিকায় যাঁদের নাম ছিল, তাঁদের নিয়ে আমরা কী ধরনের রিপোর্ট ছেপেছিলাম। জানালাম যে আমরা প্রত্যেকের নামই রিপোর্টে উল্লেখ করেছি, কারও নামই বাদ দিইনি। তখন তিনি বললেন, এবারও যেন আমরা সেটাই করি। অর্থাৎ তাঁর নামও ছাপা হবে। এরপর তিনি যে কথাটি বলেছিলেন, সেটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এত বছর হয়ে গেছে, তারপরও কথাটি হুবহু মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘মাসুম, আমার জন্য আপনাদের ভাবতে হবে না। আমার ফাইট আমিই দেব। আমার ফাইট আপনাদের দিতে হবে না। আপনারা আপনাদের কাজটি করেন।’

আমরা সেদিন তাঁর নাম ছেপেছিলাম। ওই তিন তালিকাতেই একাধিক সংবাদপত্রের মালিকের নাম ছিল। অথচ নিজের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমে নাম ছাপা বা প্রচারিত হয়েছিল একজনেরই, লতিফুর রহমান। আসলে শেষ বিচারে স্বাধীন সংবাদপত্রই টিকে থাকে। স্বাধীনতার চর্চা ভেতর থেকেও করতে হয়। আর তাই প্রথম আলো তখনো ছিল দেশের ১ নম্বর সংবাদমাধ্যম, এখনো আছে।

আর কেবল সে সময়েই নয়, পরেও অনেক অনুসন্ধান করেও দুর্নীতি বা কর ফাঁকির কোনো প্রমাণই তাঁর বিরুদ্ধে পায়নি সরকার। বরং সেরা করদাতা হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পেয়েছিলেন কর বাহাদুর পুরস্কার।

লেখক: হেড অব অনলাইন, প্রথম আলো