বিকিকিনির পাশাপাশি পর্যটনের জন্যও তাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ভাসমান হাট। স্থানীয় লোকজন বলছেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় এ বছর পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। আগ্রহী পর্যটকদের জন্য ছোট ছোট নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চের ব্যবস্থা হয়েছে। গড়ে উঠেছে হরেক রকম খাবারের দোকান। 

ঝালকাঠি কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঝালকাঠি সদর উপজেলার ২১টি গ্রামে মোট ৮০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০০ চাষি পরিবার পেয়ারাবাগান করেছেন। এর মধ্যে কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম—কীর্তিপাশা, ভীমরুলি, মীরাকাঠি, ভৈরমপুর, ডুমুরিয়া, খেজুরা, খোদ্দবরাহর, বেশাইন খান, শংকর ধবল, বেউখান ও স্থানসিংহপুর এবং নবগ্রাম ইউনিয়নের নবগ্রাম, হিমানন্দকাঠি, দাড়িয়াপুর, সওরাকাঠি ও গাভারামচন্দ্রপুর—এই পাঁচ গ্রামে সবচেয়ে বেশি পেয়ারা উৎপাদিত হয়। আষাঢ়-শ্রাবণসহ তিন মাস ভাসমান নৌকায় পেয়ারার হাট বসে। সব মিলিয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলায় বছরে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়, যা কেনাবেচায় প্রায় ৪৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। 

অন্যদিকে, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী জলাবাড়ি ও সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের ৬৫৭ হেক্টর জমিতে রয়েছে ২ হাজার ২৫টি সুদৃশ্য পেয়ারাবাগান। ২০০ বছর ধরে গ্রামগুলোয় বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারার চাষ হচ্ছে। নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, জিন্দাকাঠি, আদমকাঠি ও ধলহার খালে পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন ভাসমান হাট বসে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা হাটে পেয়ারা কিনতে আসেন। এ বছর প্রতি হেক্টরে পেয়ারার ফলন হয়েছে গড়ে ১০ টন। 

এলাকার প্রবীণেরা জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে ভীমরুলি বিলের আশপাশে শুরু হয় পেয়ারার আবাদ। ভারতের গয়া থেকে আনা হয়েছিল এই পেয়ারার জাত। পরে এটি অবশ্য স্বরূপকাঠি জাত নামেই পরিচিতি পায়। বংশপরম্পরায় এখানকার মানুষ পেয়ারার আবাদ করছেন। সাধারণত মাঘ-ফাল্গুন মাসে পেয়ারাগাছে ফুল আসে। আর ফল পাকা শুরু হয় আষাঢ়ে। পেয়ারার পাশাপাশি আমড়া, কাগজি লেবু, জাম্বুরাসহ বিভিন্ন সবজি চাষেও সাফল্য পেয়েছেন চাষিরা। ভীমরুলির পেয়ারাচাষি অমূল্য হালদার জানান, ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা ও আমড়াবাগান করে এ বছর ২ লাখ টাকার ফল পেয়েছেন তিনি। ঢাকা-চট্টগ্রামের পাইকারেরা এসে বাগান থেকেই ফল কিনে নিয়ে গেছেন। আরেক বাগানমালিক পরিতোষ মজুমদার বলেন, গত ১০ বছরে পেয়ারার ফলন ও বেচাবিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। দ্রুত পচনশীল পেয়ারা ও সবজি সংরক্ষণে জেলায় কোনো হিমাগারের ব্যবস্থা না থাকলেও পদ্মা সেতুর কল্যাণে এখন তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে পাইকারেরা পেয়ারা নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেন। 

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এখানকার পেয়ারাবাগানগুলো পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। সে অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হাতে নেওয়া হয়েছে। 

ভীমরুলি পেয়ারার ভাসমান হাটের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে গৌরব ইকো পেয়ারা পার্ক, যেখানে ঢুকতে লাগে ৩০ টাকা। ভেতরে বিশ্রামাগার, শৌচাগার ও পিকনিক করার সুবিধা আছে। গৌরব পার্কের ব্যবস্থাপক দীপংকর ঢালী বলেন, পেয়ারার মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার দর্শনার্থী পার্কে আসেন। বন্ধের দিনে পাঁচ থেকে সাত হাজার লোকও হয়। শীতে দূরদূরান্ত থেকে পিকনিক করতে আসে মানুষ।

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, কীর্তিপাশার বিল অঞ্চলের কৃষকেরা কান্দি বা সজ্জন পদ্ধতিতে দেশি পেয়ারার চাষ করেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পেয়ারা, আমড়া ও সবজি ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে ‘সদাই’ নামে একটি অ্যাপ চালু করা হয়েছে। চাষিরা প্রতিবছরই পেয়ারা ও আমড়া চাষে লাভবান হচ্ছেন। তবে পেয়ারার চেয়ে আমড়ায় লাভ বেশি হওয়ায় আমড়াবাগানের প্রতি চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে। 

লেখক:প্রথম আলোর ঝালকাঠি প্রতিনিধি