ধীরে, হিসাবহীন সিঁড়ির অন্ধকার পেরোলে আলো ফুটতে থাকে। প্রথম আলো। বুঝি, বর্তমানে বাঁচতে হলে এখানে থাকতে হবে, লিখতে হবে। কিন্তু বলতে গেলেই তো টুঁটি শুকিয়ে কথারা হারিয়ে যায়। লিখতে পারি না। খাবার লিখতে গিয়ে দেখি, ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করছে ভেতরটা। অন্যের জীবন লিখত গেলে দেখি, দূরে, নিজের না জানা জীবন নিয়ে অপমান চেপে দাঁড়িয়ে আছে সেই রোগা-পাতলা তরুণ। নিজের ছায়াকেও সে অতিক্রম করতে পারছে না। এসব দেখে মুখের ওপর ঝট করে কেউ ছুড়ে দিল অপমান। তবু টের পাই, এই দৃশ্যের বাইরেও জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই লেখা শেখার নেশায়, এক বেলা পেটপুরে খাওয়ার আশায় কাঙালের মতো থেকেছি। গলার ভেতর কান্না লুকালে ক্ষুধার যন্ত্রণা কমে আসে। তাই কান্না চেপে মনের ভেতরে শ্রী জাগানো লেখার মানুষগুলোর সমূহ কথা ও খাওয়ার দৃশ্য হাঁ করে গিলতাম।

লেখা তো দূরস্থ, একসময় দিন পেরোনোর ভাষা হারিয়ে ফেলি। ঘুমানোর মতো নিজস্ব ঘর নেই। তাই চোখ বন্ধ করে দেয়ালহীন দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ি অজানা ঘরে। সেখানে ঘুমাতে গিয়ে কেঁদে ফেলা আমি ভাবি, চোখ খুলে যেন দেখি দশদিকে থোকা থোকা ফুটে আছে ফুল। কিন্তু না, ফুল ফোটার বদলে ঘন কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারদিক। এসব শহুরে জটিলতায় বড় অসহায় লাগে, মাতৃহীন মনে হয় নিজেকে। ভেতরের গোপন কাঙালকে মনে মনে বলেছি, ‘ও কাঙাল, জটিলতা পেরিয়ে আমায় নিয়ে চলো অজানা ভূগোলের দিকে।’ কিন্তু কাঙাল আমায় ফিরিয়ে এনেছে লেখার কাছে, প্রথম আলোর কাছে। বন্ধুর মতো বলেছে, ‘লেখো। লেখাই তোমায় নিয়ে যাবে গন্তব্যের দিকে।’

তারপর শেখা-লেখার যুগলবন্দী। টের পাই—সেই কবে প্রেম ছেড়ে আসা আমি প্রথম আলোর সবকিছুকে ভালোবেসেছি। একসময় মাতৃরূপী, ভাই-বন্ধু-বোনরূপী, অভিভাবকরূপী সহকর্মীদের হাওয়ার সঙ্গে নিজের হাওয়া মিলিয়ে জুড়ে গিয়েছি প্রথম আলোর সঙ্গে। অনেক চড়াই-উতরাই আর করোনাকাল পেরিয়েও শস্যদানার মতো ছড়িয়ে আছি। সে শস্যদানার ওপর ছাতিমগাছের ছায়া হয়ে আছে প্রথম আলো। জানি, ভেতরের কাঙাল আমায় আশীর্বাদ করেছে, এখনো প্রথম আলোয় থাকার আয়ু দিয়ে যাচ্ছে।

এত দিন পর জুম করে সেই যে ক্ষুধাপেট, শুকনা-রোগা-পাতলা একমাথা চুলের তরুণের চুলে বিলি কেটে আদর করে দিতে ইচ্ছা করছে। একসঙ্গে মাংসের ঝোল দিয়ে ভরপেট ভাত খেয়ে, ধীরে সন্ধ্যার আগে কাঁধে হাত রেখে বলতে ইচ্ছা করছে, ‘মন খারাপ কোরো না, সোনা। শক্ত করে থাকো। সমূহ দুঃখ, ক্লান্তি নিয়েও তুমি বহুদূর যাবে। ঘরে ফিরে যাও। ঘুমাও। মাতৃহীন একলা তোমার যদি মৃত্যুও হয়, ভেবো না। এই প্রথম আলোই তোমার মুখাগ্নি করবে।’

লেখক: প্রথম আলোর সমন্বিত বার্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক