আবদুল মালেকের মতো কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের ছোট ছোট কাজ দিয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে যান। কারও কারও উদ্যম, চেষ্টা, সংগ্রাম, সাফল্য ও সততার গল্প অসামান্য। সাধারণের মধ্যে যাঁদের অসাধারণ অর্জন, সেসব প্রান্তজনের কথা প্রথম আলোর প্রথম পাতায় উঠে আসছে প্রতি রোববার। বিশেষ আয়োজনটির নাম ‘সময়ের মুখ’।

শুরু হয়েছিল ২ জানুয়ারি ২০২২। এরপর প্রতি রোববার সময়ের মুখ হিসেবে ‘অকীর্তিতজনের’ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে প্রথম আলোতে, প্রথম পাতায়। রাজনীতি, দুর্নীতি, হানাহানি, মৃত্যু, দুর্ঘটনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি—ক্লিশে হয়ে যাওয়া সংবাদের মাঝে একটু আগ্রহ উদ্দীপক, হাঁপ ছেড়ে বাঁচার মতো একটু ভালো খবর এই সময়ের মুখ। ছোট প্রশ্ন, ছোট উত্তর। প্রশ্ন ভারী নয়, সহজ ও সাধারণ। যেমন, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় পুলিশের চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে যাওয়া, পরে চাকরিটি পাওয়া বরিশালের তরুণী আসপিয়া ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রথম বেতন পেয়ে কী করবেন? আসপিয়া বলেছিলেন, প্রথম বেতনের টাকা তিনি মায়ের হাতে দেবেন। সেটাই হয়েছিল সময়ের মুখের প্রথম পর্বের শিরোনাম, ‘প্রথম বেতন পেয়ে মায়ের হাতে তুলে দেব’।

এ ধরনের সাক্ষাৎকার যে পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হতে পারে, সেই ‘আইডিয়া’ দিয়েছিলেন প্রথম আলোতে সবার বড় বোনের ভূমিকায় থাকা সুমনা শারমীন (আনুষ্ঠানিক পদ ফিচার সম্পাদক)। সম্পাদক মতিউর রহমানের সম্মতি পেয়ে তিনি একদিন বললেন, জানুয়ারি (২০২২) মাস থেকেই এটি শুরু করতে চান।

সম্ভবত গত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে, সুমনা শারমীন বার্তা বিভাগের বিকেল চারটার সংবাদ পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থিত হলেন। সেখানে নতুন আয়োজনের নাম নিয়ে আলোচনা হলো। কয়েকটি প্রস্তাবের মধ্যে সময়ের মুখ নামটি নিয়ে আপত্তি কম ছিল। সেটি গেল সম্পাদকের সম্মতির জন্য। 

আমি কিছুটা সন্দিহান ছিলাম এ কারণে যে প্রতি সপ্তাহে সময়ের মুখ করার মতো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে কি না। আমার সহকর্মীদের কারও কারও যে সেই সন্দেহ ছিল না, সেটা জোর দিয়ে বলতে পারব না। কিন্তু আমরা দেখলাম, বাংলাদেশের অকীর্তিতজনেরা প্রতি সপ্তাহে দারুণ কিছু করছেন। কেউ পিছিয়ে থাকা জাতিগোষ্ঠী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন, কেউ কুড়িয়ে পাওয়া টাকা ফিরিয়ে দিতে শহরজুড়ে মাইকিং করছেন, কেউ সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়ছেন অন্যায়ের প্রতিবাদে, কেউ মানুষকে সহায়তা দিচ্ছেন কোনো লাভের আশা ছাড়াই, কোনো মেয়ে রীতির বাইরে গিয়ে দেনমোহর হিসেবে ১০১টি বই চাইছেন, কেউ বৃদ্ধ বয়সে নদীতে দীর্ঘ পথ সাঁতার কেটে রেকর্ড গড়তে উদ্যোগী, কোনো চিকিৎসক বেড়াতে গিয়ে নদীর পাড়ে প্রসববেদনা ওঠা নারীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন, কোনো পুলিশ সদস্য বাড়ি ফেরার সময় ঝুঁকি নিয়ে ডাকাত ধরছেন, কোনো রিকশাচালক ৯৯৯–এ ফোন করে ধর্ষকদের ধরিয়ে দিয়েছেন—আরও অনেক সাহসী কাজ, উদ্যোগ, সততা, কীর্তি গড়ে চলেছেন অকীর্তিতজনেরা।

সত্যিটা হলো, আমাদের ভাবনা এত বড় ছিল না। তবে শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছিল, সময়ের মুখ হবেন তাঁরা, যাঁরা একেবারে সাধারণ মানুষ, প্রান্তজন। আমরা মাঝেমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়া কোনো কোনো ব্যক্তির নাম সময়ের মুখ হিসেবে প্রস্তাব করেছি। কিন্তু সম্পাদকের উত্তর ছিল, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে কাউকে খোঁজো।’

সময়ের মুখ আয়োজনটি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কি না, সে বিষয়ে জরিপ নেই। তবে দরিদ্র পরিবারের কোনো সন্তান অথবা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্যের সাফল্য সময়ের মুখের মাধ্যমে উঠে আসার পর আমরা দেখেছি, অনেকে তাঁদের সহায়তা করেছেন, করতে চেয়েছেন।

সময়ের মুখের একজন নিয়মিত পাঠক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক ইএক্সপির নির্বাহী পরিচালক ফারুক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এখন তো নিউজ (সংবাদ) মানেই আতঙ্ক। সেখান থেকে আমার জন্য বিশাল রিলিফ (মুক্তি) প্রথম আলোর সময়ের মুখ।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি রোববার আমি সময়ের মুখটি আগে পড়ি। এরপর নানা ধরনের নেতিবাচক সংবাদ পাঠ করে মন যখন খারাপ হয়, তখন আবার সময়ের মুখ পড়ে একটা ভালো অনুভূতি নিয়ে শেষ করি।’ 

লেখক: ডেপুটি হেড অব রিপোর্টিং (অনলাইন), প্রথম আলো