প্রারম্ভিক শিশুবিকাশ ও প্রাক্​প্রাথমিক শিক্ষা

জন্ম থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণ (০-৮ বছর) পর্যন্ত বয়সের শিশুদের এই স্তরে ধরা হয়। পাঁচ বছর বয়স থেকে এক বছরের প্রাক্​প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া প্রারম্ভিক শিশুবিকাশের কোনো জাতীয় কার্যসূচি নেই। প্রাক্​প্রাথমিকের পূর্ববর্তী প্রায় দেড় কোটি শিশুর এক ক্ষুদ্র অংশ (মাত্র ১০-১৫ শতাংশ) বিচ্ছিন্ন স্বেচ্ছাসেবী, বাণিজ্যিক ও কিছু সরকারি শিশুসেবা ও যত্ন কার্যসূচিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সীমিত সক্ষমতা সেবার মান ও প্রসার বিঘ্নিত হওয়ার বড় কারণ। এই মন্ত্রণালয়ে নারীদের জন্য একটি অধিদপ্তর আছে, কিন্তু শিশুদের জন্য তা নেই।

প্রাথমিক শিক্ষা

 প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত বয়সের ১৮ শতাংশ শিশু নাম লেখায়। মোট প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে, যেগুলোয় ৭০ শতাংশ শিশু পাঠ গ্রহণ করে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্যিক ‘কিন্ডারগার্টেন’ স্কুলে এবং এনজিও পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। ভর্তি হওয়া শিশুর এক-পঞ্চমাংশ স্তরটি শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। আরও বড় সমস্যা, পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও অধিকাংশ শিশু পড়া, লেখা ও গণনার প্রয়োজনীয় দক্ষতা আয়ত্ত করে না। বাংলাদেশসহ নিম্ন আয়ের দেশের এই ব্যর্থতাকে বিশ্বব্যাংক ‘শিক্ষাদারিদ্র্য’ বলে অভিহিত করেছে। ভিত্তি পর্যায়ের এই দুর্বলতা শিশুদের পরবর্তী স্তরের শিক্ষার অর্জন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত করে।

মাধ্যমিক শিক্ষা

প্রায় ১৯ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠদান হয়। ২ হাজার উচ্চবিদ্যালয়ে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পড়ানো হয়। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিক্ষার্থী, অর্থাৎ নির্ধারিত বয়সের দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মাত্র ৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি সরকারি। ১ শতাংশ ইংরেজি মাধ্যমের এবং বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। অবশিষ্ট ৯৩ শতাংশ সরকারি আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে এবং বিভিন্ন সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। এই স্তরের তিনটি বড় সমস্যা-ঝরে পড়া, শিক্ষার্থীর অতি দুর্বল অর্জিত দক্ষতা এবং টেকসই উন্নয়নের ২০৩০ সালের সর্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষার অভীষ্টের জন্য কোনো লক্ষ্য বা পরিকল্পনার অভাব।

কারিগরি শিক্ষা

তরুণদের উপার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি করে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থার এক প্রধান লক্ষ্য। অথচ এই উপখাতের প্রতিষ্ঠান ও কার্যসূচি শিক্ষার্থীদের কাছে ও সমাজের কাছে বিশেষ পছন্দের নয়। সরকারের লক্ষ্য, এই উপখাতের শিক্ষার্থীসংখ্যা দ্রুত বাড়ানো-বর্তমানের প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে মধ্য মেয়াদে ২০ শতাংশে ও দীর্ঘ মেয়াদে ৫০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। এ জন্য প্রধান সরকারি কৌশল-সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কারিগরি বিষয় ঢোকানো, আলাদা কারিগরি প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি বাজার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সাধারণ বিদ্যালয়ে কারিগরি শিক্ষা বিশেষ কার্যকর হয় না। কিন্তু এটিই কারিগরি শিক্ষার্থীর অনুপাত বাড়ানোর প্রধান উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতায় মান ও লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হচ্ছে।

মাদ্রাসাশিক্ষা

সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত আলিয়া মাদ্রাসা ও রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানবহির্ভূত কওমি মাদ্রাসাশিক্ষাব্যবস্থায় প্রাক্​প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এক সমান্তরাল ধারায় পরিণত হয়েছে। কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের প্রতিবেদনে মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের কর্মী তৈরির পেশাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে বিবেচিত হয়েছিল। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যাপক প্রসারের পর বর্তমানে দেশের মোট শিক্ষার্থীর এক-চতুর্থাংশ দুই ধারার মাদ্রাসাশিক্ষার্থী বলে অনুমান করা যায়। একুশ শতকের আর্থসামাজিক আবহে এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জীবন ও জীবিকার জন্য কীভাবে প্রস্তুত করা যাবে এবং এ সম্বন্ধে নীতি ও কৌশলে রাষ্ট্রীয় অবস্থান কি সংগত হবে, তা এক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ ব্যাপারে আলোচনায় আগ্রহী বলে মনে হয় না। 

উচ্চশিক্ষা

উচ্চশিক্ষার সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই চাহিদা পূরণে ১৯৯০-এর দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মূল ধারার বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত ডিগ্রি কলেজে ও বিভিন্ন উচ্চতর পেশাগত শিক্ষার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশি আলোচনার বিষয়বস্তু হলেও কলেজগুলোয় উচ্চশিক্ষার তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করে। এগুলো বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ দেশের দক্ষ কর্মশক্তির সবচেয়ে বড় জোগানদাতা। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের মান বড় সংকটে। উচ্চশিক্ষার সাম্প্রতিক ব্যাপক বিস্তার সত্ত্বেও উপযুক্ত বয়সের ২০ শতাংশের কম উচ্চশিক্ষায় অংশ নেয়, যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অপ্রতুল। 

জীবনব্যাপী ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা

টেকসই উন্নয়নের ২০৩০ সালের অ্যাজেন্ডায় জীবনব্যাপী শিক্ষাসুযোগের ব্যাপক প্রচারের কথা বলা হয়েছে। এই সুযোগ তৈরির অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও আছে, বিশেষত এনজিওগুলোর উদ্যোগে। এ জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো রয়েছে। কিন্তু কিছু গতানুগতিক বয়স্ক সাক্ষরতা কার্যক্রম ও বিদ্যালয়বহির্ভূত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রের প্রকল্পভিত্তিক (সরকারের নিয়মিত বাজেটবহির্ভূত) কিছু কাজ ছাড়া কোনো সামগ্রিক দক্ষতা বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগসহ জীবনব্যাপী শিক্ষার চিন্তাভাবনা দেখো যায় না।

শিক্ষার এই বড় তুলিটানা চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর প্রত্যাশী এবং একুশ শতকের বৈশ্বিক অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন দেশ ও সমাজ হিসেবে শিক্ষার প্রকৃতি ও সংস্থান নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। শুধু উপখাত নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক-কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর পেশাদারত্ব ও দক্ষতা নিয়ে নতুন চিন্তা, যথার্থ অর্থায়ন, শিক্ষণ-শিখনের প্রযুক্তির ব্যবহারসহ উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষায় মান, সমতা ও অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্রের আর্থরাজনৈতিক অবস্থান স্থির করতে হবে।

একুশ শতকের শিক্ষা আংশিক হলেও বাণিজ্য। কিন্তু এই বাণিজ্যকে জনহিতবাদ নীতির প্রয়োগে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি গণতন্ত্র, সাম্য, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ-শিক্ষায় ও সমাজে কীভাবে ব্যক্ত হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। 

লেখক: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক