নদীভাঙনের কবলে পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এসে ভর্তি হলাম কুষ্টিয়া শহরতলির জগতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর কোনোভাবেই আর বই–খাতার টাকা জোগাড় করা যাচ্ছিল না। আমার পুরোনো অঙ্ক খাতার বেশ কিছু পাতা ফাঁকা ছিল। সেটা নিয়ে অনেক দ্বিধার সঙ্গে স্কুলে গেলাম।

স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক শরীফ স্যার ক্লাসে এসে ঢুকলেন। ক্লাস শেষে বললেন, ‘তোমাদের কেউ বই না কিনে থাকলে স্কুল শেষে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো।’ স্কুল শেষ করে অবনত মুখে আমি স্যারের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। স্যার বললেন, ‘আমার ভাতিজা এবার ক্লাস সেভেন থেকে এইটে উঠেছে। ওর পুরোনো বই তোমাকে দিতে পারি।’ স্যারের সাইকেলের পেছনে চড়ে তাঁর বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। স্যার বইগুলো গুছিয়ে সুন্দরভাবে বেঁধে দিলেন।

কয়েক দিন পর স্যার আমাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি কি প্রাইভেট পড়তে চাও?’ বললাম, ‘স্যার, প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য তো আমার নেই।’ স্যার বললেন, ‘কাল থেকে তুমি আমার কাছে পড়তে এসো। বেতন দিতে হবে না।’ আগে আমি অঙ্কে টেনেটুনে পাস করতাম। এবার সবাই আমাকে ‘পণ্ডিত’ বলে ডাকতে শুরু করল।

এসএসসির নিবন্ধনের সময় চোখে শর্ষে ফুল দেখতে শুরু করলাম। নিবন্ধনের ফিস হিসেবে বাড়ির পোষা ছাগলটা নিয়ে গেলাম স্কুলে। কিন্তু কেউই সাহায্য করল না। শরীফ স্যার বললেন, ‘ছাগলটা রেখে দিচ্ছি। ওর নিবন্ধনের যত টাকা লাগে আমিই দিয়ে দেব।’ এভাবে স্যারই আমাকে মাধ্যমিকের সিঁড়ি পার করিয়ে দিয়েছিলেন।

স্কুলজীবন শেষে ভর্তি হলাম কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হওয়ায় কোনো না কোনো গন্ডগোল লেগেই থাকত। সেভাবে ক্লাস হতো না। স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়ে সিলেবাস শেষ করতে হতো। প্রথম পড়তে শুরু করেছিলাম আতিয়ার স্যারের কাছে। প্রথম দিনই পড়া শেষে আলাদা ঘরে গিয়ে স্যারকে বললাম, ‘স্যার আমি যে বেতন দিতে পারব না।’

চশমা চোখে স্যার যে দৃষ্টি হানলেন, তাতে মিথ্যা বললে তক্ষুনি ধরা খেতে হতো। তিনি জানতে চাইলেন কেন। বললাম, ‘আব্বা সামান্য রাজমিস্ত্রির জোগালি, তাঁর পক্ষে খরচ চালানো সম্ভব নয়।’ স্যার সব মুশকিল আসান করে দিলেন।

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের সময়ও হাতে টাকা নেই। আতিয়ার স্যার সবই জানতেন। তিনি বললেন, ‘তুই পড়াশোনার দিকে খেয়াল রাখ, বাকিটা আমি দেখছি।’ স্যার আমাকে তত দিনে তুমি থেকে তুই বলতে শুরু করেছেন। স্যারের সহায়তায় কুষ্টিয়ার তখনকার ডিসি তাঁর তহবিল থেকে আমাকেসহ মোট তিনজনকে উপবৃত্তি দিয়েছিলেন।

ভর্তি হলাম বুয়েটে। ভর্তির পরের ধাপ কোর্সের রেজিস্ট্রেশন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক ঠিক করে দেওয়া হয়, যিনি বুয়েটে শিক্ষার্থীর ভালো–মন্দের দেখভাল করবেন, বুয়েটের ভাষায় একাডেমিক অ্যাডভাইজার। আমার অ্যাডভাইজারের নাম ড. হাসিব এম আহসান।

স্যারের সঙ্গে কোর্স রেজিস্ট্রেশনের কাজ সেরে আমি আমার আর্থিক অবস্থার কথা খুলে বললাম। স্যার মনোযোগ দিয়ে শুনে বললেন, ‘ভেবো না। যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছেন।’

বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়েও স্যার অভূতপূর্ব একটা কাজ করলেন। হলের গার্ড দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠিয়ে জানালেন, আমার জন্য একটা টিউশনি ঠিক করেছেন। টিউশনিটা অবশ্য আমার দোষেই বেশি দিন টিকল না। স্যার বললেন, ‘বেশি ভেবো না। আমি খুঁজছি, তুমিও খুঁজতে থাকো।’ স্যার ঢাকা শহরে আমার অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।

আব্বার রাজমিস্ত্রির জোগালির টাকায় দুমুঠো খাবারই শুধু জুটত। পড়াশোনা ছিল চূড়ান্ত বিলাসিতা। সেটা পদে পদে সহজ করে দিয়েছিলেন আমার শিক্ষকেরা। আমার জীবনের সব অর্জনের কৃতিত্ব তাই আমার শিক্ষকদের। আর সব স্যাররা এখনো বেঁচে থাকলেও করোনার সংক্রমণ শরীফ স্যারকে কেড়ে নিয়েছে। এই মানুষগুলোর অবদান কি কোনো দিনই ভুলে যাওয়া সম্ভব?