তখন থেকেই বুঝেছেন জীবনের জন্য কী সংগ্রাম করতে হয়। ২০১৩ সালে নজরুল যখন এইচএসসি সমমানের আলিম পাস করেন, তখন তাঁর প্রবাসী বাবা শামসুল হক আর বড় ভাই সোহেল বিদেশ থেকে চাকরিহারা হয়ে ফিরে আসেন। সংসারে আয়–উপার্জনের লোক আর কেউ রইল না। নজরুল চোখে অন্ধকার দেখেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা অব্যাহত রেখে উচ্চশিক্ষা লাভ করা।

সেই আশায় চট্টগ্রাম সরকারি মহসিন কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু বাড়িতে তীব্র অভাব–অনটন। টিউশনি করে যা পান, সব বাড়িতেই পাঠিয়ে দিতে হতো। সে বছর কলেজে ভর্তি হলেও পড়ালেখা আর চালিয়ে যেতে পারেননি। এ রকম একটা প্রতিকূল সময়ে নজরুলকে পথ দেখালেন তাঁরই এলাকার এক বড় ভাই মিজান এবং তাঁর বন্ধু নাসির।

নাসির শিক্ষিত ছেলে। পড়ালেখার ফাঁকে তিনি সকালবেলা মানুষের ঘরে ঘরে পত্রিকা বিক্রি করতেন। নাসিরই জানালেন, সকালবেলা পত্রিকা বিক্রি করে সারা দিন আর কোনো কাজ থাকে না। পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়া যাবে। আশায় বুক বাঁধেন নজরুল। ২০১৩ সালেই হকার্স সমিতির কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন। পাশাপাশি শুরু করলেন পড়ালেখা। হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ থেকে ২০১৯ সালে অনার্স এবং এ বছর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন।

নজরুল জানান, তাঁর আয়ের প্রধান উৎস প্রথম আলো। কারণ, প্রথম আলো একা যা চলে, অন্য সব পত্রিকা মিলে অতটা চলে না। এই আয় দিয়েই নিজে চলেন, পরিবার চালান। বাবার বয়স হয়েছে, কোনো কাজ করতে পারেন না। বড় ভাইও বেকার। এই পত্রিকার কাজ করেই দুই বোনের বিয়ের খরচ দিয়েছেন। মাস্টার্স পাস করেছেন। তারপরও পড়ালেখা শেষ হয়নি তাঁর। এখন জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস পরীক্ষা দেওয়ার। তাঁর আশা, সরকারি চাকরি করবেন। অঙ্ক ও ইংরেজিতে নিজেকে একটু দুর্বল মনে করেন। তাই ওদিকে জোর দিচ্ছেন বেশি।

নজরুলের জীবনসংগ্রামে অনুপ্রেরণা দেন বন্ধুরা। কথায় কথায় বললেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র গিয়াস উদ্দিনের কথা। তিনি প্রয়োজনের সময় সাহায্য করেন। উৎসাহ দেন হকার্স সমিতির সেক্রেটারি নজরুল ইসলাম রিটন। রেজাউল করিম নামের এক বড় ভাইও তাঁর পাশে থাকেন।

নজরুল বললেন, করোনার আগে যে রকম আয় ছিল, এখন তা নেই। খুব কষ্ট হয় সব দিক সামলাতে। নগরের মেহেদীবাগ, আমিরবাগ, চট্টেশ্বরী, গোলপাহাড় এবং ওআর নিজাম সড়কে প্রতিদিন ১৪০টি ঘরে ভোরে একটি তরতাজা পত্রিকা পৌঁছে দেন। করোনার আগে আরও বেশি ঘরে যেতে হতো।

নিজের এবং বাড়ির খরচ কুলায় না। তার ওপর সামান্য পত্রিকা বিক্রেতা বলে মাঝেমধ্যে মানুষের ভাষা ও আচরণ তাঁকে মানসিকভাবে আহত করে। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন নজরুল। দারিদ্র্য, মানুষের অবহেলা, শ্রমের কষ্ট কোনো কিছুকেই গায়ে মাখছেন না। নিজের কাজ করেই যাচ্ছেন। পত্রিকা বিক্রি করছেন, আবার অবসরে প্রথম আলো পড়ছেন, পড়ছেন নানা বই।

নজরুল বলেন, প্রতিদিন জানতে হবে, শিখতে হবে। এর জন্য পড়ালেখার কোনো বিকল্প নেই। নজরুল মনে করেন এখন যে সরু অন্ধকার গুহার মতো পথটি বেয়ে তিনি এগোচ্ছেন, তার অপর প্রান্ত থেকে আলো এসে তাঁকে উদ্ভাসিত করবেই। সেই দিনের অপেক্ষায় নজরুল।