আলাপে আলাপে নাজমুল জানালেন, তাঁদের বাড়ি ছিল দাকোপ উপজেলার চালনা বাজারে। দেশ স্বাধীনের পর তাঁর বাবা চলে আসেন বটিয়াঘাটার বাইনতলায়। স্থানীয় একজন প্রভাবশালীর দেওয়া জায়গায় ঘর তুলে থাকতেন। পরের খেতখামারে কাজ করলেও সংসার ঠিকমতো চলত না। স্কুলে কিছুদিন যাওয়ার পর আর্থিক দৈন্যের কারণে তাঁকে পড়াশোনার পাট চুকাতে হয়। দুরন্তপনায় মেতে ওঠার বয়সে কাঁধে নিতে হয় সংসারের কঠিন জোয়াল।

মাত্র ৮ বছর বয়সে খুলনার একটি চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন নাজমুল। চিংড়ি বাছাইয়ের ওই কাজে দিনে ১২ ঘণ্টা সময় দিয়ে হাতে পেতেন ৬০ টাকা। বছরখানেক সেখানে কাজের পর সংবাদপত্র বিক্রির পেশায় আসেন। শহরের একটি সিনেমা হলে ছবি দেখতে এসে আলাপ-পরিচয় ঘটে সংবাদপত্র বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে। তাঁদের কাছে পত্রিকা বিক্রির খুঁটিনাটি জেনে নিজেই জড়িয়ে পড়েন এ কাজে।

নাজমুল বলেন, ‘২০০ টাকা নিয়ে পত্রিকাজগতে পথচলা শুরু। আমাদের ওই এলাকায় তখন কোনো হকার ছিল না। অল্পস্বল্প করে পত্রিকা নিয়ে বিক্রি আরম্ভ করি। রূপসা ঘাটে তখন ফেরি ছিল। রাত চারটায় বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বের হতাম। রাস্তায় ভয়ও পেতাম। প্রায় ২২ কিলোমিটার পথ পার হয়ে ভোরের কিছু পর শহরে পৌঁছাতাম। এরপর ১৬ বছর ধরে সাইকেলে করে পত্রিকা নিয়ে গ্রাহকের কাছে কাছে গেছি।’

এখন রূপসা সেতুর পূর্ব পাড় থেকে বটিয়াঘাটার প্রত্যন্ত গ্রামের ‘বিরাট’ বাজার এলাকা পর্যন্ত পত্রিকা পৌঁছে দেন নাজমুল। প্রতিদিন খুব সকালে এসে শহরের পরিবেশকের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে যান। আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় তাঁকে। সাইকেলে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি ভর করতে থাকে নাজমুলের। শরীরও মাঝেমধ্যে সায় দিত না। বছর চারেক আগে নাজমুলের চিন্তায় আসে, রাস্তা সহজ করতে কিছু করা যায় কি না। দু–একবার মোটরসাইকেল নেওয়ার ভাবনা উঁকি দিলেও খরচের কথা ভেবে চিন্তাটা আর মাথায় গেড়ে বসেনি।

 তবে বিকল্প ভাবনায় ঠিকই উপায় বাতলে নিয়েছেন নাজমুল। বছর তিনেক ধরে প্যাডেলচালিত সাইকেলের পরিবর্তে এক বিশেষ ধরনের সাইকেল ব্যবহার করছেন তিনি। মোটরসাইকেলের টায়ার, ভ্যানের চাকা, ব্যাটারি, মোটর—এসব দিয়ে বিশেষভাবে বানানো তাঁর ওই সাইকেল। একটা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে মাসে মাসে কিস্তিতে সাইকেল তৈরির ৩২ হাজার টাকা শোধ করেছেন।

নাজমুল বলেন, ‘সাইকেলে দীর্ঘদিন তো কষ্ট করেছি। দীর্ঘ পথ প্যাডেল করে কষ্ট হয়ে যেত। এখন নিজের পথচলা সহজ হয়েছে। তেমনি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমার গ্রাহকের কাছে পত্রিকাটা পৌঁছাতে পারছি। আগে সব গ্রাহকের হাতে কাগজ দিয়ে বাড়ি ফিরতে চারটার মতো বাজত। এখন বেশ কিছুটা আগেই কাজ শেষ হয়। আর রুট বাড়িয়ে হলেও কাস্টমার সংখ্যা যে পড়তে দিইনি, তা এই গাড়ির জন্যই সম্ভব হয়েছে।’

আলাপের ফাঁকে জীবনের অতীতের সঙ্গে এখনকার তুলনা টেনে নাজমুল বলেন, ‘একটা সময় তো না খেয়েও থাকতে হয়েছে। বৃষ্টির পানির ওপর শুয়ে থাকতে হয়েছে। পত্রিকা বিক্রির মাধ্যমেই একটা জায়গা কিনেছি।

চারতলার ভিত্তির ওপর একতলার কাজ শেষ করেছি। সংসার পাতার প্রস্তুতিও চলছে। সবচেয়ে বড় কথা, এলাকায় একটা সামাজিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। মা–বাবাকে ভালো রাখতে পারছি। বাকি দিনগুলোতে এই জগতেই থাকতে চাই।’

নাজমুলের বিশ্বাস এখন দৃঢ় হয়েছে, একটা কাজে ধৈর্য ধরে লেগে থাকলে তার ফল মিষ্টি হবে। নাজমুল বললেন, কষ্ট করলে যে কেষ্ট মেলে, তার প্রমাণ তিনি।