মহেশপুর উপজেলা শহরটি বেশ পুরোনো। একসময় এখানে স্বর্ণ ব্যবসার চল ছিল। দুই ভাই আবদুর রহিম আর আবদুল হামিদও সে ব্যবসাই করতেন। তাঁদের একটা দোকান ছিল, নাম মুসলিম জুয়েলার্স। ১০ জন কারিগর মিলে দিনভর সেখানে তৈরি হতো অলংকার। তারপর?

আবদুল হামিদ বলেন, ‘২০০৩ সালের দিকে হঠাৎ সোনার দাম বেড়ে যায়। ৫ হাজার টাকা ভরি সোনা ২ বছরের মধ্যে হয়ে যায় ১৬ হাজার টাকা। আমাদের খদ্দের কমে যায়। ব্যবসা বন্ধ হওয়ার অবস্থা। তখন শুরু করি সিটি গোল্ডের ব্যবসা। ব্রোঞ্জে তৈরি অলংকারের ওপর সোনালি রং দিলেই হয়ে যায় সিটি গোল্ড।’

দাম বাড়ায় সোনার গয়না চুরি-ছিনতাইও বেড়ে গিয়েছিল। তাই কম দামি সিটি গোল্ডের দিকেই ঝুঁকতে থাকে মানুষ। অল্প দিনেই ব্যাপক সাড়া। মাত্র ছয় মাসে চাহিদা এত বেড়ে যায় যে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে বড় করতে হয় কারখানা। শ্রমিকের সংখ্যা শ ছাড়িয়ে যায়। আশপাশের ব্যবসায়ীরাও তখন এই বিকল্প পথে হাঁটতে শুরু করেন।

মহেশপুরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেল, বাড়ি বাড়ি তৈরি হচ্ছে এই অলংকার। বিশেষ করে নওদাপাড়া, জলিলপুর, রামচন্দ্রপুর, বামনগাছি, সেজিয়া, যাদবপুর, মহেশপুর পৌর এলাকাসহ বেশ কিছু গ্রামে ঘরে ঘরে গড়ে উঠেছে কারখানা। বেগমপুর নওদা গ্রামের আবুল কাশেম জানান, গয়না তৈরিতে যা খরচ হয়, তার দ্বিগুণ মূল্যে তাঁরা বিক্রি করতে পারেন। তিনি নিজে কারখানা গড়েছেন। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ জোড়া কানের দুল তৈরি করেন। এতে দৈনিক তাঁর আয় হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

আরেক গয়নার কারিগর জাহিদুল ইসলামের সঙ্গেও কথা হলো। ১৫ বছর ধরে তিনি এই পেশায় আছেন। চার সদস্যের সংসার চালিয়ে কিছু জমিও কিনেছেন। কারখানায় তাঁরা দুভাবে পারিশ্রমিক পান। কেউ দিনমজুরি চুক্তিতে, কেউ কাজের ভিত্তিতে। তাঁর ভাষ্য, যে যেভাবেই কাজ করুক না কেন, দিন শেষে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। অনেকে অতিরিক্ত সময় কাজ করে বেশি টাকাও আয় করছেন।

সিটি গোল্ডের ব্যবসায়ী রশিদুন্নবী মিলন জানান, একজোড়া কানের দুল তৈরির পেছনে খরচ হয় সাত থেকে আট টাকা। পাইকারি বাজারে এগুলো ১০ থেকে ১২ টাকা দরে বিক্রি হয়। পরে হাতবদল হয়ে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয় ২০ টাকায়। এ ছাড়া গলার চেইন ৪০ থেকে ৫০ টাকা, হাতের বালা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা। নকশার কারণে দাম কমবেশি হয় বলে জানান এই ব্যবসায়ী।

আবদুল হামিদ জানান, বাড়ি বাড়ি কারখানা গড়ে ওঠায় লাভের পরিমাণ কিছুটা কমে গেছে। তবে অনেকেই কাজ করছেন বলে এলাকায় বেকারত্ব দূর হয়েছে। এই শিল্পের সঙ্গে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের সহজ শর্তে ঋণ প্রয়োজন। স্থানীয় লোকজন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। এই প্রশিক্ষণ মাঝেমধ্যেই হওয়া জরুরি বলে মনে করেন হামিদ।

সিটি গোল্ড যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের কী বক্তব্য? কালীগঞ্জ উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের শিল্পী খাতুন জানান, খাঁটি সোনার অলংকারও তাঁর আছে। তবে সব সময় তো আর এগুলো ব্যবহার করা যায় না। মূল্যবান সোনা গায়ে নিয়ে বাইরে বের হতেও ভয় করে। ছিনতাইয়ের ভয়ও থাকে। কিন্তু সিটি গোল্ডের অলংকার চুরি-ছিনতাইয়ের শঙ্কা নেই। অন্যদিকে, নানা নকশার গয়নাও পরা যায়। শিল্পী বলেন, ‘সিটি গোল্ডের অনেক গয়না খুব কাছ থেকে না দেখলে বোঝাই যায় না, এগুলো আসল সোনা নয়।’

লেখক: প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ