জ্বালানির পরিকল্পনা করা হবে এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে, তারপর যখন এলএনজির দাম বাড়বে, তখন হুট করে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হবে, এটা কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনার নমুনা হতে পারে না। উচিত ছিল এলএনজি আমদানি আর তেল ও কয়লা–নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের বদলে সেই টাকা নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে ব্যয় করা, দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে সক্ষম করা।

 বাপেক্সকে ভারতের ওএনজিসির মতো সক্ষম করার কথা কিন্তু পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যানেও বলা হয়েছিল। মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে এলএনজি আর কয়লার আমদানি–নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে, এলএনজি আর কয়লা আমদানির টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানেরই আরেকটি অংশে যেখানে বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল, সেটা কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেসরকারি মালিকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে ভাড়া বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও গ্যাস উত্তোলন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তার ভগ্নাংশও বিনিয়োগ করা হয়নি।

জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর তার জন্য চাই দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের স্থলভাগ ও সাগরের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ। তেল, কয়লা বা এলএনজির দামের কোনো স্থিতিশীলতা থাকে না, এগুলোর সরবরাহের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না, পারমাণবিক বিদ্যুতের জ্বালানি ইউরোনিয়ামের জন্যও বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।

দেশের টাকায় দেশীয় কর্তৃত্বে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা আমরা জানি। দেশের স্থলভাগ ও সাগরের গ্যাস উত্তোলনের জন্যও কিন্তু একই মডেলের কথা বলা হচ্ছে বহু বছর ধরে। পদ্মা সেতু নির্মাণের নকশা করেছে মার্কিন কোম্পানি এইসিওএমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল। মূল সেতুর ঠিকাদার ছিল চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি, নদীশাসনের কাজ করেছে চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন, সেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পরামর্শক ছিল কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন। পদ্মা সেতুর মতো জটিল ও ব্যয়বহুল সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতাও আগে বাংলাদেশের ছিল না, কিন্তু দেশি–বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অর্থের বিনিময়ে কাজে লাগিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ।

তেল-গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রেও কিন্তু এই পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে বহু বছর ধরে। সাগরের তেল-গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই, স্থলভাগে আছে। কিন্তু যাদের সাগরে গ্যাস উত্তোলনে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে, তাদের ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ করে সাগরের গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে পদ্মা সেতুর চেয়ে বহুগুণ কম খরচে মূল্যবান গ্যাস উত্তোলন করা যেত। তাতে বিদেশি কোম্পানিকে ঠিকাদারির জন্য অর্থ দিতে হলেও গ্যাসের মালিকানা বা গ্যাসক্ষেত্রের কর্তৃত্ব দিতে হতো না। বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল এলএনজিও আমদানি করতে হতো না।

আফসোস হলো, পদ্মা সেতুর মতো ব্যয়বহুল ও জটিল একটা প্রকল্প বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব কর্তৃত্বে নির্মাণ করলেও, তুলনামূলক কম খরচে সাগরের গ্যাস উত্তোলনের কোনো উদ্যোগই নেয়নি। আজ তারই খেসারত দেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন স্থানীয়ভাবে প্রাপ্য নিরাপদ ও তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব জ্বালানি (আমাদের ক্ষেত্রে গ্যাস) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি—এর কোনো ব্যতিক্রম করে আর যা–ই হোক, সস্তায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না।

কল্লোল মোস্তফা লেখক ও প্রকৌশলী, সর্বজনকথা সাময়িকীর নির্বাহী সম্পাদক