এ ছাড়া চারুকলার সনাতন শিক্ষাপদ্ধতির একটা বাস্তবতা আছে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারব, চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার থেকে এসেছে। আবার এই ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে চারুশিল্পে আধুনিকতাও এসেছে। তবে বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই আধুনিকতারও বদল ঘটছে। একসময় শিল্পকলার প্রাণকেন্দ্র ছিল ইউরোপ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সে বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটে। তার ফলে শিল্প-সংস্কৃতির কর্তৃত্বপরায়ণ কেন্দ্রটি ইউরোপ থেকে সরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন ধরনের আধুনিকতা আমাদের শিল্পজগতে বিস্তার লাভ করে। 

এর পাশাপাশি গত শতকে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী—এ দুই রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত ছিল। এ দুটি শিবির থেকে আমরা আধুনিক শিল্পরীতি ও ভাষ্য গ্রহণ করেছি। সমাজতান্ত্রিক শিল্পবোধ আমাদের শিল্পীদের ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে শিল্পচর্চায় অনুপ্রাণিত করেছে। আমরা যাকে সোশ্যাল রিয়েলিজম বা সামাজিক বাস্তবতা বলি, তা এই ধারা থেকে এসেছে। এ শিল্পভাষার মধ্যে সর্বজনগ্রাহ্য শিল্পরীতি প্রকাশের একটা প্রয়াস ছিল। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনসহ প্রধান শিল্পীদের মধ্যে সেই শিল্পভাষা ও আঙ্গিকের ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাই। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন প্রভাবাধীন শিল্পচর্চা ও বিশেষ বিমূর্ত প্রকাশবাদ আমাদের দেশে বড় অভিঘাত তৈরি করেছিল। সেটি উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল। পাকিস্তানের শিল্পীদের আত্মপরিচয় নির্ধারণে সেই শিল্পভাষা ভূমিকা রেখেছিল। এসব বিবেচনায় না নিলে শিল্পচর্চার বিষয়টি বোঝা সম্ভব নয়। 

আমাদের শিল্পসত্তার ক্রমবিকাশের ধারা বুঝতে হলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টিও সামনে আনতে হবে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের পর আমাদের আত্মপরিচয়ের নতুন কাঠামো তৈরি হলো। সেটা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদনির্ভর। এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্পচর্চার গতিপথ নির্ধারিত হলো। আত্মপরিচয়ের দিকটিও নতুন করে বিবেচনা শুরু হলো। একই সঙ্গে সত্তরের দশকের উত্তাল বিশ্ব পরিস্থিতির ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছিল এর আগেই। এ দুইয়ের অভিঘাতে বিমূর্ত শিল্পকলার ধারা ম্রিয়মাণ হয়ে আবারও অবয়বনির্ভর শিল্পরীতি ফিরে এল। একটা ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা কালপর্বের বদল ঘটে গেল। মোটামুটি ১৯৮০–এর দশক পর্যন্ত যে বিমূর্ত শিল্পরীতি প্রধান হয়ে উঠেছিল, তাতে একটা ধাক্কা লাগল। তবে এই বদল আবার এক জায়গায় স্থির থেকেছে, তা বললে ভুল বলা হবে। বরং বিশ্ব পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে তা বদলেছে। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ধনতান্ত্রিক যে ব্যবস্থা প্রকট হয়ে উঠল, আমরা তার বাইরে থাকলাম না। পশ্চিমের ওপর নির্ভরতা থেকে আমাদের পরিত্রাণ মেলেনি।

হাল আমলে আমাদের শিল্পচর্চা আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। এখন আধুনিকতার একক প্রকল্পটি আর কার্যকর নয়। বর্তমানে আধুনিকতা–পরবর্তী এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। এখনকার শিল্পরূপ অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। প্রযুক্তিনির্ভর বহুমাত্রিকতা একদিকে যেমন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি এটা একটা সংকটের কারণ। বিশেষ করে প্রযুক্তির কারণে আমাদের নিজেদের বাস্তবতা আড়ালে থেকে যাচ্ছে কি না, তা ভাবতে হবে। কারণ, প্রযুক্তি নিজেও একটি কর্তৃত্বপরায়ণ হাতিয়ার বা টুলস। আমরা যে তথ্য–উপাত্ত শিল্পে ব্যবহার করছি, তা এই প্রযুক্তি থেকে পাওয়া। সে কারণে এসব তথ্য নিরপেক্ষ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে এর ওপর ভিত্তি করে আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, তা–ও নিরপেক্ষ নয়। তাই শিল্পভাবনা আরোপিত থেকে যাচ্ছে। আমাদের ধারণা বা সিদ্ধান্ত নিজেদের নয় আদতে। চিত্রভাষায়ও এর প্রতিফলন দেখতে পাই। ফর্মালিজমকে এখন অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বলা যায়, আমরা একটা আলট্রা ফর্মালিজমের যুগে প্রবেশ করেছি। এটা হয়তো এখনকার বাস্তবতা। এভাবে শিল্প তার নিজের পরিমণ্ডলের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে কি না, তা বারবার আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক: চিত্রশিল্পী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক