এক সপ্তাহ পর আবার ফোনকল। আমাকে অফিসে ডাকা হয়েছে। মনে আত্মবিশ্বাস এল, চাকরিটা বোধ হয় হবে। যাওয়ার পর তখনকার মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান শ্যামলদা বললেন, ‘শিমুল, আপনাকে দেখে মনে হয় আপনি বাসার সবার ছোট ও আদরের। চাকরি পেলে ঠিকমতো করবেন তো?’ বললাম, ‘জি, করব।’ চাকরি হলো।

কাজের ফাঁকে শ্যামলদা প্রতিদিন একবার করে আমাকে এসে দেখে যেতেন। আমার সহকর্মীদের বলতেন, ‘শিমুল ছোট মেয়ে, ওকে বেশি প্রেশার (চাপ) দিয়েন না।’ কর্মস্থলে এমন ভালোবাসা পাওয়া বিরল।

একটু একটু করে অফিসটাকে নিজের পরিবার ভাবতে শুরু করলাম। মা-বাবা, ভাই-বোন যেমন আমার একটা পরিবার, তেমনি অফিসটাও আমার একটা পরিবার হয়ে উঠল। অফিসের প্রতিদিনের ঘটনা পরিবারের কাছে শেয়ার করি। অফিসে কার কী কাজ, কাজের পরিধি, সবকিছু বাসায় মাকে গুছিয়ে বলতাম।

এরপর এল ২০২১ সাল। আমার জীবনের ঘটে যাওয়া সব থেকে মর্মান্তিক ঘটনার বছর। দেশের মানুষ তখন করোনা মহামারি নিয়ে আতঙ্কিত। দিনটা ছিল মঙ্গলবার, ৬ জুলাই।

অফিসে কর্মরত অবস্থায় আমার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রশাসন বিভাগের প্রধান উৎপলদা আমাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। প্রথমে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, এরপর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল। সব শেষে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সে সময় প্রথম আলো থেকে সার্বক্ষণিক আমার খোঁজ নেওয়া হচ্ছিল। সম্পাদক স্যার থেকে শুরু করে লাজ্জাত ভাই, উৎপলদা, কবির ভাই, শামীম ভাই—এমন কেউ নেই যে আমার খোঁজ নেননি। আমি তখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। চিকিৎসকেরাও চিন্তিত। এভাবে ১৫ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে আল্লাহর অশেষ রহমতে দ্বিতীয় জীবন পাই আমি।

প্রথম আলোর কেউ না কেউ তখন আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাহস জুগিয়েছে। প্রথম আলো থেকে আমার অপারেশনের জন্য সব খরচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে এসব ঘটনা শুনে আমি বাকরুদ্ধ। সবাই শুধু একটা কথাই বলেছেন, প্রথম আলো পাশে ছিল বলে সব সম্ভব হয়েছে। বাসায় ফেরার পরও সহকর্মীরা আমার সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেছেন, আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁদের সহযোগিতা পেয়েছি বলেই আমি দ্রুততম সময়ে সুস্থ হতে পেরেছি, ছয় মাসের মধ্যে কর্মস্থলে ফিরতে পেরেছি। আর কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীর জন্য এতটা করে কি না, আমার জানা নেই। আমি আমার প্রতিষ্ঠান নিয়ে গর্ববোধ করি। কারণ, প্রথম আলো নিয়ে গর্ব করা যায়।
লেখক: প্রথম আলোর টেলিফোন অপারেটর