বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, তারা (রোহিঙ্গারা) মিয়ানমারের নাগরিক। সুতরাং, তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারেই ফিরে যেতে হবে।’

শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, এ ব্যাপারে জরুরি প্রস্তাব গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এ ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশে যা কিছু করছি, তা সম্পূর্ণরূপে অস্থায়ী ভিত্তিতে করা হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যা কিছু করা সম্ভব, তা অবশ্যই করতে হবে। এদিকে তারা নিজেরাও তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়।

একই সঙ্গে ন্যায়বিচার ও দেশে প্রত্যাবর্তনে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দৃঢ় আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নিপীড়নের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে প্রধানমন্ত্রী প্রচার চালানোর ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর থেকেই এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য একেবারে ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আঞ্চলিক ক্ষেত্রে আমরা চীন, ভারতসহ প্রধান শক্তিগুলোকে এ সংকট সমাধানে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে আসিয়ানকে আরও সক্রিয় রাখার চেষ্টা চালিয়েছি। বহুপক্ষীয় ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করে জাতিসংঘ প্রস্তাবের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ধরে রেখেছি। তবে দুঃখজনকভাবে দুর্ভাগা-গৃহহীন হয়ে পড়া মিয়ানমারের নাগরিকদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য চালানো আমাদের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত কোনো আলোর মুখ দেখেনি। আজ পর্যন্ত একজনও তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারেনি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চার বছর ধরে বাংলাদেশ অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে যে বাস্তুহারা এসব মানুষ নিরাপদে মর্যাদাসহ তাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের আহ্বান অবহেলিত রয়ে গেছে। প্রত্যাশা অসম্পূর্ণ রয়েছে। এ সংকটের পঞ্চম বছর চলছে। বাংলাদেশ এখনো রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের আশা রাখছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘দেখা দেওয়া এই মানবিক সংকট সমাধান করা ছিল একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। বিভিন্ন সীমান্তে এর প্রভাব পড়ছে। এ ব্যাপারে অতি দ্রুত কিছু করতে ব্যর্থ হলে আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা মহাবিপদে পড়বে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যাবাসনের অগ্রগতির ঘাটতির কারণে হতাশা বৃদ্ধি পাওয়ায় রোহিঙ্গাদের অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তারা অতি সহজে জঙ্গিবাদী মতাদর্শেরও শিকার হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা এই সংকট সমাধানে পাঁচ দফা আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে প্রথমত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমাদের সকলের জোরালো প্রচেষ্টা চালানো প্রয়োজন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা দূর করতে মিয়ানমারে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটানো ও সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার একটি সংশোধন প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আসিয়ানের জোরদার প্রচেষ্টা দেখতে চান। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে এ ক্ষেত্রে আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের পদক্ষেপ মিয়ানমারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চতুর্থত, আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার, মানবিক সহায়তা জরুরি হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও তাদের ধারণক্ষমতার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘ ও অংশীদারদের মিয়ানমারে অবশ্যই স্পষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি দেখতে পাইনি।’

শেখ হাসিনা বলেন, দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হওয়া জনগোষ্ঠীর আস্থা সৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়া মোটেও উচিত হবে না। নির্যাতনকারীদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দাঁড় করাতে চলমান আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার প্রতি ঢাকার জোরালো সমর্থন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও মানবাধিকার পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মেকানিজম করতে বিশ্বের জোরালো সমর্থন চান। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে নিপীড়ন এড়াতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক আগমনের শুরুতে আমাদের করণীয় ছিল তাদের জীবন বাঁচানো অথবা সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া। সীমান্ত বন্ধ করে দিলে তারা জাতিগত নিধনের মুখে পড়ত। মানবতার দিক বিবেচনা করে আমরা তাদের জীবন বাঁচানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।’

শেখ হাসিনা বলেন, এই মানবিক সিদ্ধান্ত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রহণ করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের এ সংগ্রাম শান্তি ও ন্যায়বিচারের জন্য সর্বজনীন লড়াইয়ের প্রতীক। অতএব বাংলাদেশ বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেবে—এটাই ছিল খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সূচনা থেকেই এমনটা হয়ে আসছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকায় রোহিঙ্গারা নিরাপদে অস্থায়ীভাবে অবস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও জমির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তা করেছে। একটি সীমাবদ্ধ এলাকায় এ ধরনের বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘকাল অবস্থানে আশপাশের পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে বিভিন্ন পাহাড় ও বনভূমি কেটে ফেলতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমনকি মহামারি করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্যেও আমরা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার কথা ভুলে যাইনি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যতক্ষণ না আমরা সকলে নিরাপদ, আসলে ততক্ষণ আমরা কেউই নিরাপদ নই। আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এনেছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ কমাতে আমরা ভাসানচর নামের একটি দ্বীপে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দেশের দক্ষিণে অবস্থিত এ দ্বীপের ১৩ হাজার একর এলাকাজুড়ে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন