default-image

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো বন্ধ রয়েছে। নতুন কর্মী যেতে না পারলেও কয়েক বছর ধরে ফিরে আসছেন অবৈধ হয়ে পড়া পুরোনো কর্মীরা। এ বছর দেশটির শ্রমবাজার চালুর কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে তা পিছিয়ে গেছে। দেশটিতে কাজের চাহিদাও কমে গেছে। তাই বেকার হয়ে ফিরে আসছেন অনেকে। আবার দেশে এসে আটকা পড়েছেন অনেকে।
১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে গিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে যায় সে দেশের শ্রমবাজার।

করোনার কারণে মার্চ থেকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে উড়োজাহাজ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জুলাইয়ে উড়োজাহাজ সেবা চালু হলেও প্রবাসী শ্রমিকেরা ফেরার অনুমতি পাননি। সেপ্টেম্বর থেকে আবারও বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। এর ফলে মার্চের আগে যাঁরা দেশে ছুটিতে এসেছেন, তাঁরা যেতে পারছেন না। অধিকাংশ কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ। এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন প্রায় ২৫ হাজার প্রবাসী।
চাঁদপুরের আনোয়ার মো. সাইদ তিন বছর ছিলেন মালয়েশিয়ায়। একটি আসবাব তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। ২০ জানুয়ারি ছুটিতে দেশে আসেন। ফেরার কথা ছিল ২০ এপ্রিল। ক্যানসার আক্রান্ত বাবার চিকিৎসায় জমি বিক্রি করেছেন, এখন চলছেন ধারদেনা করে। সে দেশের সরকার অনুমতি দিলে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তাঁর নিয়োগদাতা। ভিসার মেয়াদ শেষ হবে ১১ ডিসেম্বর।

তবে কোনো আশ্বাস পাননি মুন্সিগঞ্জের মোয়াজ হাওলাদার। একটি সুপারশপে কাজ করতেন তিনি। করোনায় দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। তবে নিয়োগদাতা নিতে চান না। তাঁর আরেক ভাই অবৈধ হয়ে পড়ায় আগেই দেশে ফিরে আসেন। আয়হীন ছয়জনের পরিবারে অন্ধকার নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আনোয়ার, মোয়াজের মতো আটকে পড়া প্রবাসীরা ফিরে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন। সবাই এক বছরের ভিসা করানোর দুই-তিন মাসের মাথায় দেশে এসেছেন। এর জন্য তাঁদের ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। ঘরে বসে থেকেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেকের। তাই ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর দাবিতে গত মাসে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তাঁরা। এরপর ২ নভেম্বর রাস্তায় নেমে আসেন কয়েক হাজার কর্মী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত দাবি তুলে ধরেন তাঁরা।

আটকে পড়া প্রবাসীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, করোনা মহামারির কারণে মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিক প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু শ্রমিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। শ্রমিকদের একটি অংশ পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের কাছে দুর্দশা তুলে ধরেছেন। পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে শ্রমিকদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চলছে। পুরো বিষয়টি মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রমিকদের ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতার অনুরোধের ভিত্তিতে তাঁদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছে মালয়েশিয়া।
আটকে পড়া মালয়েশিয়াপ্রবাসীদের প্রতিনিধি নাজমুল হুদা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, তিন হাজার পাসপোর্টের অনুলিপি জমা দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় আশ্বাস দেওয়ায় আপাতত কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে না। এক সপ্তাহ পর অগ্রগতির খোঁজ নেবেন তাঁরা।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন প্রথম আলোকে বলেন, প্রবাসীদের ফেরানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় মালয়েশিয়া আশ্বস্ত করেছে। দেশটির করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেই ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এদিকে চলাফেরার ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেও করোনা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি মালয়েশিয়া। কিছুদিন ধরে সেখানে সংক্রমণ কিছুটা বাড়ছে। এর আগেই গত সেপ্টেম্বরে নতুন করে ২৩টি দেশের নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয় দেশটি। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকা এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে বাংলাদেশের নামও।

৭ মাসে ফিরেছেন ১২ হাজার

পটুয়াখালীর সালেক গাজী কাজ করতেন একটি আসবাব তৈরির কারখানায়। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো এসব আসবাব। করোনার প্রভাবে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। কাজ না থাকায় নিজেই চলতে পারছিলেন না। তাই আগস্টের মাঝামাঝি দেশে ফিরে আসেন।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলেছে, সালেক গাজীর মতো গত ১ এপ্রিল থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ হাজার ৫৭১ জন প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছেন। এর আগের তিন মাসে ফিরে আসেন আরও কিছু কর্মী। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে ফিরেছেন সাড়ে ৯ হাজার কর্মী, ২০১৮ সালে এটি একটু কমে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৩৭২ জনে। আর গত বছর এটি বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০১৯ সালে ফিরে এসেছেন ১৫ হাজার ৪৩০ জন প্রবাসী।

শ্রমবাজার চালু পিছিয়ে গেছে

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু করতে দুই বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এ বছরের শুরুর দিকে অগ্রগতির কথাও জানানো হয়েছিল। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে আলোচনাও বন্ধ হয়ে যায়। লম্বা বিরতির পর গত ১৫ অক্টোবর দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শিগগিরই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এর আগে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0