default-image

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানের স্ত্রী ছালেহা খাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর নামে ভুয়া হিসাব খুলে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার প্রায় ৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক দুই নেতা মো. এনামুল হক বিশ্বাস ও মোহাম্মদ আলী।

বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পর এই দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজেরাই ভাতার টাকা ফেরত দিয়েছেন। মিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা লিংকন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকাগুলো এখন আমাদের কাছে আছে। তা কী করব, জানতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ভাতা পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) নামে সফটওয়্যারে যুক্ত করার পর নানা অনিয়ম বেরিয়ে আসছে। এরপর কেউ কেউ নিজেরাই অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া ভাতা ফেরত দিচ্ছেন।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকা এমআইএস সফটওয়্যারে তোলার আগে দেশে ভাতাপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার জন। বছরের পর বছর ধরে জেলা প্রশাসনের তালিকার ভিত্তিতেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা পাঠানো হতো। কিন্তু এমআইএসের মাধ্যমে তথ্যভান্ডার তৈরির পর গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের ভাতা পাঠাতে গিয়ে দেখা যায়, সংখ্যাটি হঠাৎ ২১ হাজার কমে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এমআইএসে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। এরপর আরও এক মাস কেটেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গত রোববার পর্যন্ত আগের ভাতাপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ১৫ হাজার জনের নাম এমআইএসে আসেনি। সন্দেহ করা হচ্ছে, এঁদের অনেকে দুই জায়গা থেকে অথবা অনিয়মের মাধ্যমে ভাতা নিতেন। ভাতা নেওয়ার জন্য যাঁরা এসব অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে সাধারণ বীর মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জিত।

অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া ভাতা ফেরত দেওয়া ব্যক্তিদের একজন সিরাজগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দুই উপজেলা থেকে (সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও বগুড়ার ধুনট) ভাতা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। চিঠিতে তিনি ধুনট থেকে পাওয়া ভাতা বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ধুনট থেকে নেওয়া ভাতা ফেরত দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে গত রোববার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজীপুর ও ধুনটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) চিঠি দিয়ে আমজাদ হোসেনের ভাতা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, আমজাদ হোসেন এখনো অবৈধভাবে নেওয়া ভাতা ফেরত দেননি। তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। চিঠিতে তাঁর আত্মসাৎ করা টাকার হিসাব তৈরি করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আমজাদ হোসেনের আবেদনে উল্লেখ করা মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে এই প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। পরে বলেন তিনি আমজাদ হোসেন নন। এরপর ফোন করা হলে তাঁর নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

আমজাদ হোসেনের মতো অবৈধভাবে নেওয়া ভাতা বাবদ ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোবারক আলী।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বান্দরবন জেলার একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, বান্দরবান জেলায় সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্য জেলায়ও পাওয়া গেছে। তাঁরা দুই জেলা থেকে ভাতা নিচ্ছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখছে মন্ত্রণালয়।

যাঁরা অনিময় করে ভাতা নিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন–১৯১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের তালিকায় বিভিন্ন সময় আট হাজার জনকে পাওয়া গেছে, যাঁরা বীর মুক্তিযোদ্ধা নন।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কাছে দুই ধরনের তথ্য আসছে। কেউ কেউ দুই উপজেলা থেকে ভাতা নিয়েছেন। আবার তালিকায় থাকা কারও কারও বয়স এখন ৫০–এর নিচে। এঁদের সকলকে ভাতা ফেরত দিতে হবে।’ তিনি বলেন, নতুন করে যাচাই–বাছাইয়ে যাঁদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হবে, তাদেরও ভাতা ফেরত দিতে হবে।

দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এখন মাসে ১২ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া দুই ঈদে ১০ হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা, বিজয় দিবসে ৫ হাজার টাকা ও নববর্ষে ২ হাজার টাকা ভাতা পান। সব মিলিয়ে বছরে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা।

দেশে বর্তমানে তালিকাভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার। কেউ কেউ আইনি জটিলতার কারণে ভাতা পান না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার এ পর্যন্ত আট হাজার মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল করেছে। সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন