
সরকারের অনুমতি ছাড়াই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেপ্তার করতে পারবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সরকারি কর্মচারী আইনের খসড়ায় এই ধারা যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এর আগে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনের খসড়ায় এ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
গত বছরের ১৩ জুলাই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত এই আইনের খসড়ায় বলা হয়েছিল, সরকারি দায়িত্ব পালন-সংক্রান্ত কোনো মামলায় অভিযোগপত্র হওয়ার আগে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করতে চাইলে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এ নিয়ে অনেক বিতর্কের পর আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছে। মন্ত্রণালয় দুদক আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির এখতিয়ার বহাল রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আইন করার পক্ষে মত দিয়েছে। গত সপ্তাহে এই মতামত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্ন উঠেছিল, আগের প্রস্তাবিত সরকারি কর্মচারী আইন অনুযায়ী দুদক আইন দুর্বল হয়ে যাবে কি না। আইন মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে খসড়াটি ঠিকঠাক করে দিয়েছে। ফলে দুদক আইন থেকে সরকারি কর্মচারীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে বলে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তা আর থাকবে না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আইনটি পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। এর আগে সরকারি কর্মচারী আইনের যে খসড়া মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে, তাতে দুদক আইনটি কিছুটা খর্ব করা হয়। খসড়ায় বলা হয়েছিল, সরকারি দায়িত্ব পালন-সংক্রান্ত কোনো মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা হওয়ার আগে কাউকে গ্রেপ্তার
করতে চাইলে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বা সরল বিশ্বাসে কোনো কাজের জন্য অথবা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যমূলক মামলায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য এই বিধান রাখা হয়েছিল।
আইনটি পর্যালোচনার সঙ্গে জড়িত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দেশি-বিদেশি বেশ কিছু আইন পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন কমিশন ও কমিটির প্রতিবেদনও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দিতে আরেকটি আইন সংসদে পাস হয়েছিল। দুদক সংশোধন আইনের ৩২(ক) ধারা অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা আবশ্যিকভাবে পালন করতে হবে।
প্রসঙ্গত, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় বলা আছে যে জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হলে সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত সেই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না। কোন আদালতে এই মামলার বিচার হবে, তা সরকার নির্ধারণ করে দেবে। এর ফলে কমিশন সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আমলে নিতে পারছিল না।
সংসদে পাস হওয়া ওই আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছিল। রাষ্ট্র বনাম হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের ওই মামলার রায়ে হাইকোর্ট আইনকে সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেন।
ওই রায়ে বলা হয়, কোনো একটি দুর্নীতির ঘটনায় সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের সঙ্গে সরকারি কর্মচারী জড়িত থাকলে সরকারপ্রধান কিংবা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে; কিন্তু সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে অনুমতি লাগবে। এই পরিস্থিতির সমন্বয় কীভাবে ঘটানো হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা সংশোধিত দুদক আইনে নেই। আইনে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করাটা অযৌক্তিক বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
রায়ে আরও বলা হয়, সংশোধিত এ আইন দেশের সাধারণ মানুষ ও দুর্নীতিগ্রস্তদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করবে। দুর্নীতিবাজদের রক্ষাকবচ হবে, যা অসাংবিধানিক।
উচ্চ আদালত ওই রায় দেওয়ার পরও ২০১৫ সালে মন্ত্রিসভা সরকারি কর্মচারী আইনের খসড়া অনুমোদন করে, যা হাইকোর্টের রায়ের চেতনার পরিপন্থী বলে মত দেন আইন বিশেষজ্ঞরা। মন্ত্রিসভা আইনটি অনুমোদন দেওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে যে সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের গ্রেপ্তার করতে হলে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের বেলায় তা হবে কেন?
আইনটির খসড়া থেকে সমালোচিত বিষয়টি বাদ দেওয়ায় সরকারি কর্মচারী আইনটি জনবান্ধব, দক্ষ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, যুগোপযোগী ও তথ্যপ্রযুক্তিসম্পন্ন হবে বলে মত দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি দুদক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এই মুহূর্তে কারও বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজনীয় নয়। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনা।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় নব্বইয়ের দশকে। তখন এর নাম ছিল সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট। এ-সংক্রান্ত নানা উদ্যোগের মধ্যে ছিল জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলের সহায়তায় প্রকল্প প্রণয়ন, বিদেশ ভ্রমণ এবং বিভাগীয় শহরে সেমিনার আয়োজন। অংশীজনদের সঙ্গেও দিনের পর দিন বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ২০১১ সালের মার্চে এর খসড়া তৈরি তরে তা ওয়েবসাইটে দিয়ে মতামত নেওয়া হয়।
২০১৩ সালে এসে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট নয়, সরকারি কর্মচারী আইন করা হবে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট করলে শুধু ক্যাডার কর্মকর্তারাই অন্তর্ভুক্ত হবেন। তাই সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি কর্মচারী আইনের খসড়া করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে বেসামরিক প্রশাসন আইনের মাধ্যমে পরিচালনার বিধান থাকলেও কোনো সরকারই সেই আইন প্রণয়ন করেনি। প্রতিটি সরকারই পছন্দমাফিক নীতিমালা করে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেছে, যার ফলে দলীয় প্রশাসন গড়ে উঠেছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, আইনের বদলে একটি করে কমিশন কিংবা কমিটি গঠন করেছে। এসব কমিটি বা কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, তার বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য আইন করা জরুরি। কিন্তু তাঁদের জন্য এক রকম এবং রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম আইন কাম্য হতে পারে না। আর দুর্নীতিবিরোধী আইনের ক্ষেত্রে সমতা রাখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় বুঝেশুনেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয়।