হাইকোর্টের রায়ে অভিমত
অপরাধী সংগঠনের শাস্তি ও নিবন্ধনের বিষয়ে আইন সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন
কোনো দলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তার বিরুদ্ধে দণ্ড আরোপের সুনির্দিষ্ট বিধান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ওই দলকে নিবন্ধন দেওয়ার বিষয়ে আইনটিকে সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বেআইনি ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এমন অভিমত দিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, সংসদের উচিত এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতকে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত করে অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান ছিল না। সম্প্রতি আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত দলকে বিচারের সম্মুখীন করার বিধান করা হয়েছে (ধারা-৩)। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ওই আইনে এর দণ্ড এবং সাজা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই। আদালত অভিমত দেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তসমূহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৯০-বি এবং ৯০-সি-তে উল্লেখ করা আছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কিংবা যেকোনো সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত কোনো রাজনৈতিক দলকে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যদি অপরাধী সংগঠন হিসেবে ঘোষণাও করেন, তাহলেও ওই দলকে নিবন্ধন দেওয়া যাবে না—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়নি।
রায়ে আরও বলা হয়, বর্তমান আইনের কারণে নির্বাচন কমিশন কারও নিবন্ধনের আবেদন অগ্রাহ্য করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে আইনটিকে আরও সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। সার্বভৌম জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কারণ, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে একমাত্র জাতীয় সংসদ—সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে।
রায়ে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-বি ও ৯০-সি-এ একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য যেসব শর্তের উল্লেখ রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক দল ধর্মের অপব্যবহার কিংবা অপব্যাখ্যা করলে তাকে নিবন্ধন দেওয়া যাবে না, এমন কিছু সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। যদিও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২(গ)-এ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি উল্লেখযোগ্য মূলনীতি হলো ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার বিলোপ করা’। এটি রাখা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বাস্তবায়নের জন্য। আদালত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলবৎ করতে পারেন না। রাষ্ট্রকেই মূলনীতির আলোকে কাজ করতে হয় এবং হবে। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের তথা সংসদের।
রায়ে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদী সম্পর্কে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেমে দীন, ওলামায়ে কিরাম, ইসলামি গবেষক ও চিন্তাবিদদের মূল্যায়ন বিবেচনা করলে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবীদের বক্তব্যে যথেষ্ট সমর্থন পাওয়া যায়, মাওলানা মওদুদী ও তাঁর সৃষ্ট জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র এবং ধ্যানধারণা ও কর্মকাণ্ড অনেক ক্ষেত্রে ইসলাম, ইমান ও আকিদার পরিপন্থী।
প্রসঙ্গ টেনে আরও বলা হয়, ইসলাম ধর্ম ও রাসুল (সা.)-এর সুন্নাতসমূহ পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশে ‘দেওবন্দ’, ‘আহলে হাদিস’, ‘তাবলিগ জামাত’, ‘হানাফি মাজহাব’সহ বিভিন্ন মাজহাবের নিজস্ব কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, রীতিনীতি এবং চর্চা পদ্ধতি বিদ্যমান। কিন্তু তাঁরা সবাই মাওলানা মওদুদী ও তাঁর জামায়াত সম্পর্কে এক ও অভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৫৯ ও ৬০ ধারা উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলকে তাদের দলীয় তহবিল সংগ্রহ এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের কল্যাণের লক্ষ্যে ‘জাকাত’ এবং ‘উশর’ সংগ্রহ এবং এর ব্যয় অনুমোদন দেওয়া যায় না। কারণ, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে যদি এ ধরনের জাকাত সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। কেননা, পবিত্র কোরআন অনুযায়ী, জাকাত সংগ্রহ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এর হকদার। কোনো রাজনৈতিক দল যেন জাকাত বা উশরের অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে দলীয় তহবিল গঠন করতে না পারে, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন আদালত।