বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিয়োগ বাতিলের প্রজ্ঞাপনের বিষয়টি গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম নিয়ে গত ১২ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘এখন এক কোটি দেব, পরে আরও পাবেন’ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনটি করেছিলেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন গত ১৩ এপ্রিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই শেষ পর্যন্ত নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু আলোচিত প্রতিবেদন গত এপ্রিল ও মে মাসের শুরুতে প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। এর মধ্যেই গত ১৭ মে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে রোজিনা ইসলাম সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। সেদিন তাঁকে মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা ও নির্যাতন করা হয়। ওই দিন রাত সাড়ে আটটার দিকে মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে প্রথমে শাহবাগ থানায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর রাত পৌনে ১২টার দিকে রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের অধীনে শাহবাগ থানায় মামলা দেওয়া হয়। পরদিন ১৮ মে সকালে তাঁকে থানা থেকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে রাখা হয়। আর দুপুরের দিকে তাঁকে আদালতকক্ষে নেওয়া হয়। শুনানি শেষে তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানো হয়। আটকের ছয় দিন পর ২৩ মে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন তিনি।

এখনো রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তাঁর প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড, দুটি মুঠোফোন ও পাসপোর্ট জব্দ রয়েছে। এসব ফেরত চেয়ে তাঁর করা আবেদন গত রোববার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নাকচ করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে যা আছে
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়োগ বাতিলের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, মেডিকেল টেকনিশিয়ান ও কার্ডিওগ্রাফার পদে নিয়োগের বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নির্দেশনা দিয়েছেন, যেহেতু তদন্ত প্রতিবেদনে লিখিত পরীক্ষার খাতায় অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে মর্মে উল্লেখ রয়েছে, সেহেতু ওই নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করে পুনরায় নতুন নিয়োগ স্বল্প সময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক। এর আগে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের নতুন করে আবেদনের প্রয়োজন নেই, তাঁরা নতুন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

গত বছরের ২৯ জুন মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ৮৮৯টি, মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের ১ হাজার ৬৫০টি এবং কার্ডিওগ্রাফার পদে ১৫০ জনসহ মোট ২ হাজার ৬৮৯টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। করোনাকালে সরকারি হাসপাতালে কারিগরি জনবলের ঘাটতি মেটাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই সব পদে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল।

এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের লিখিত পরীক্ষায় ২ হাজার ৫২১ জন উত্তীর্ণ হন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৫ শতাংশের মতো। তবে যাঁরা উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ খুব ভালো নম্বর পান, যা থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়।

লিখিত পরীক্ষায় অনিয়মের সন্দেহ হয় মৌখিক পরীক্ষা নিতে গিয়ে। নিয়োগ কমিটির সদস্যরা তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, লিখিত পরীক্ষায় যেসব প্রার্থী ৮০ নম্বরের মধ্যে ৬০ থেকে ৭৯ পেয়েছেন, তাঁরা মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। বরং ভালো করেন লিখিত পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরা।

প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছিল, মৌখিক পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতে নিয়োগ বোর্ডের এক সদস্যকে ঘুষ ও পদোন্নতির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন আরেক মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব। এ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে দেওয়া চিঠিতে নিয়োগ কমিটির এক সদস্য অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে নগদ এক কোটি টাকা এবং পরে আরও টাকা ও পদোন্নতি দেওয়ার লোভ দেখানো হয়।

এদিকে নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া সঠিক ছিল কি না, তা যাচাই করবে। পাশাপাশি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র নিরীক্ষণে অসংগতি হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে সে ক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দায়দায়িত্ব নিরূপণ করবে।

তবে নিয়োগ বাতিল করে গত সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে লিখিত পরীক্ষার অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ওই নিয়োগ বাতিল করে প্রমাণ করেছে, প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘এখন এক কোটি দেব, পরে আরও পাবেন’ সঠিক ছিল। তবে শুধু নিয়োগ বাতিল করলেই হবে না, লিখিত পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা বা যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনেরও পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। জনস্বার্থে এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। যদি এ বিষয়গুলো পরিষ্কার না হয়, তাহলে বুঝতে হবে এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজদের আরও ওপরের স্তরের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন