default-image

অবসরেই মনের পুষ্টি, অবসরেই মনের স্ফুরণ। কিন্তু তার জন্য অবসরও হতে হয় অর্থময়। জীবনের তীব্র প্রতিযোগিতাময় অনিশ্চয়তা, নগরের ভাঙাচোরা বিস্তার আর প্রযুক্তির চিন্তাহীন ব্যবহার কি সেই অর্থময় অবসরকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে? তাহলে তো বলতে হবে, আমাদের ভবিষ্যৎই অসম্ভব এক ঝুঁকির মধ্যে ঢুকে পড়ছে। প্রথম আলোর তারুণ্য জরিপে দেখছি সেই ঝুঁকিরই আশঙ্কা।

কৈশোরকালে আমাদের অবকাশের বড় সময় কাটত বই পড়ে। একেকটা বইয়ে চেপে আমরা কল্পনার দিগন্ত পার হয়ে যেতাম। তাতে তৈরি হয়ে উঠত আমাদের মন। আর বিনোদন ছিল মা-বাবার বেঁধে দেওয়া সময়টুকুর মধ্যে স্বল্পকালের টিভি-দর্শন। তাতে একদিকে থাকত নির্মল বিনোদন, আরেক দিকে মন তৈরির মতো বিশ্ব চলচ্চিত্র, বিশ্ব নাটক। সে যুগ এখন বাসি। নতুন প্রযুক্তির ধাক্কায় পুরোনো সে জীবন চৌচির।

বাংলাদেশের তরুণেরা টেলিভিশনে সময় কাটাচ্ছে বেশি। কিন্তু তাদের টিভির পর্দায় রুচিময় দেশি বিনোদনের জোগান কোথায়? বাইরের টিভির ফাঁপিয়ে তোলা কৃত্রিম সোপ অপেরায় বেশির ভাগ সময় সেঁটে থাকছে তাদের চোখ, মন আর কল্পনা। বই আর পত্রিকা পড়ার সময় তার কমে এসেছে। বাইরের রক্তমাংসের মানুষের জগৎ থেকে মোবাইলের ইন্টারনেট তাদের আরও বেশি করে সরিয়ে এনেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্তর্মুখী দুনিয়ায়। তাদের কল্পনা সজীব হয়ে উঠবে কীভাবে? কী করে ডানা গজাবে মনে?

নিজের একান্ত পৃথিবীতে পরিবার আর বন্ধুরাই এখনো তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। নিজের বাইরের পৃথিবীতে খেলা। এই কৃতিত্বের বড় ভাগটাই হয়তো ক্রিকেটের। কিন্তু একটি খেলার আড়ালে আরও সব খেলা হারিয়ে যাওয়াও কি কাজের কথা? ফুটবল বা হাডুডুর মতো সহজ উপকরণের খেলায় তরুণদের আনার পথ করে দিতে হবে না—শহরে, গ্রামে, গঞ্জে?

তরুণদের নিয়ে আসলে আমাদের ভাবনা নেই। নিরুদ্বেগ ও পরিকল্পনাহীন সামাজিক বাস্তবতার অসহায় শিকার আমাদের তরুণেরা। আমরা তাদের নিশ্বাস ফেলার মুক্ত আকাশ দিতে পারিনি।

আমাদের শহরগুলো আকাশচুম্বী হচ্ছে ইট-কাঠ-পাথরে, রেস্তোরাঁ-লাউঞ্জ-শপিং মলে। অজ পাড়াগাঁয়েও মিলছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য। গ্রাম নাকি দ্রুত নগর হচ্ছে। আধুনিক অগ্রসর জীবনের প্রবেশপথের খোঁজ পেতে তরুণেরা ব্যাকুল ও অস্থির। কিন্তু এ কোন নগর? তাদের জন্য এখানে পাঠাগার কোথায়? কোথায় বছরে অন্তত দুটি-একটি ভালো চলচ্চিত্র, আরামে ছবি দেখার সিনেমা হল, গানের মঞ্চ, দৌড়ানোর মাঠ, ঘন সবুজের বিস্তার? কোথায় সামাজিক মেলামেশার মুক্ত চত্বর? বিটিভি কেন নিয়ম করে দেখাচ্ছে না সপ্তাহে একটি করে পৃথিবীর সেরা চলচ্চিত্র, সেরা নাটক? অর্থপূর্ণ অবসরযাপনের উপাদান তো আমরাই তরুণদের হাতে তুলে দিইনি। আমরা যারা শহর গড়ে তুলছি, সংস্কৃতির আয়োজন করছি, উন্নয়নের গর্ব করছি।

নির্মল অবসরযাপনের অবকাশ করে দিতে না পারলে তরুণেরা সে অবসর কাটাতে যাবে ঘুরপথে অথবা বিপথে। তার পরিণতি হবে আরও ভয়াবহ। সুস্থ বিনোদনের অভাবে এ রোগও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ভুলে গেলে চলবে না, বিউটি বোর্ডিংয়ের তুমুল আড্ডাই একদিন বাংলাদেশের সাহিত্যের রাস্তা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস কলকাতাকে ভরিয়ে দিয়েছিল স্মরণীয় চলচ্চিত্র, গান আর কবিতায়। এ দেশের তরুণদের জন্য আমাদেরই ভাবনা রাখতে হবে। নইলে উদ্ভাবনী কল্পনা আর সরস মনের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নাগরিক আমরা পাব না। পাব উন্নয়নের জোয়ারে ভাসা প্রাণহীন এক ভবিষ্যৎ।

মানুষ নিছক কাজের সমষ্টি নয়। কাজকে অর্থময় করতে তাকে অবকাশের মধ্যে যেতে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘বস্তু যখন আপনার অবকাশকে হারায় তখন তাহাই মৃত্যু।...প্রাণ সেই মহাঅবকাশ—যাহাকে অবলম্বন করিয়া বস্তু আপনাকে কেবলই আপনি ছাড়াইয়া চলিতে পারে।’

অবসর কীভাবে আনন্দ, মাধুর্য ও অর্থময় করে তোলা যায়; কেন সেটা তাদের জীবনে জরুরি—সে কথাও আমরা তরুণদের ভালো করে বুঝিয়ে বলছি তো? আমরা অভিভাবকেরা আর শিক্ষকেরা?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0