default-image

বাংলাদেশে করোনার রোগীদের শ্বাসকষ্টের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ধরনের একটি যন্ত্র কিনতে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ডের (প্রায় ৫৮ লাখ টাকা) তহবিল গঠন করেছিলেন কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)। তবে চার মাস সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় যোগাযোগ করেও তাঁরা যন্ত্রটি বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারেননি। অবশেষে সেই তহবিলের টাকায় কেনা চিকিৎসাযন্ত্র দেওয়া হয়েছে উগান্ডা ও ফিলিস্তিনকে।

যন্ত্রটির নাম কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার (সিপ্যাপ)। গত বছর করোনা মহামারি শুরুর দিকে রোগীদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা সামাল দিতে যন্ত্রটি বেশ সাড়া ফেলে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটাল (ইউসিএলএইচ), ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মার্সিডিজ যৌথ উদ্যোগে এই যন্ত্র তৈরি করে।

বাংলাদেশের করোনার রোগীদের জন্য দুই হাজার সিপ্যাপ কিনে দিতে তহবিল গঠনের উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের সাংসদ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আইনজীবী মনোয়ার হোসেনসহ অনেকে। ইউসিএল কোনো মুনাফা না করে বাংলাদেশকে যন্ত্রটি দিতে রাজি হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তহবিলের টাকায় বাংলাদেশে যন্ত্র কিনে পাঠানোর বিষয়ে গত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ই-মেইলে যোগাযোগ করে উদ্যোক্তরা। এসব ই–মেইলের কয়েকটিতে দেখা যায়, ইউসিএলের অধ্যাপক রেবেকা শিপলি বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে সহায়তা না পাওয়ায় উদ্যোগটি এগোনো যাচ্ছে না বলে হতাশা প্রকাশ করেন। ই-মেইলে তিনি বলেন, ‘এ কাজে আমি প্রচুর সময় এবং শ্রম ব্যয় করেছি।’

পুরো বিষয়টি জানতে চাইলে অধ্যাপক শিপলি ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার কারণ নিয়ে প্রথম আলোর কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে ই-মেইলে জানতে চাওয়ার পর ইউসিএলের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জবাব আসে, বাংলাদেশের জন্য সংগৃহীত তহবিলে যাঁরা টাকা দিয়েছেন, তাঁদের অনুমতি সাপেক্ষে ওই অর্থ অন্যান্য অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সিপ্যাপ পাঠানোর কাজে লাগানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে উগান্ডা ও ফিলিস্তিনে সিপ্যাপ সরবরাহ করা হয়েছে।

ইউসিএলএইচের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ১২০টি হাসপাতালে ১০ হাজার সিপ্যাপ ব্যবহার করছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিপ্যাপের নকশা উন্মুক্ত করার জন্য ৩ হাজার ৪৩৯টি অনুরোধ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০৫টি দেশের ১ হাজার ৯৭০টি প্রতিষ্ঠানকে নকশা সরবরাহ করা হয়েছে।

তহবিল সংগ্রহের উদ্যোক্তাদের একজন মনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে যন্ত্রটি কাজে লাগবে, এমন চিন্তা থেকে তিনি ইউসিএলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেক ই-মেইলের পর তাঁরা নিজেরা তহবিল সংগ্রহে নেতৃত্ব দিয়ে সাহায্য হিসেবে মোট দুই হাজার যন্ত্র পাঠাতে রাজি হন। কথা ছিল ইউসিএল কোনো লাভ করবে না। শুধু উৎপাদন, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক খরচ রাখবে। তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের সাংসদ রুশনারা আলীর নেতৃত্বে গত বছরের ১১ আগস্ট একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ড (২৯ লাখ টাকা) সংগৃহীত হয়। এ ছাড়া আরও প্রায় ২৫ হাজার পাউন্ডের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। ইউসিএল যুক্তরাজ্য সরকারের কাছেও এ খাতে অনুদান দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। এ ছাড়া তহবিল সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তারা ‘ইউসিএল ভেঞ্চুরা সিপ্যাপ বাংলাদেশ ক্যাম্পেইন’ নামে একটি ভিডিও প্রচার করেন।

অর্থ জোগাড় হওয়ার পর যন্ত্রগুলো বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি ও অধ্যাপক শিপলি দীর্ঘ চার মাস বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু কেউ কোনো দায়িত্ব নেননি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ই-মেইলের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তহবিলে যাঁরা অর্থসহায়তা দিয়েছিলেন, তাঁদের একজন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ব্যবসায়ী সি মার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উচিত সময়মতো ই–মেইলের জবাব দেওয়া এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া। কোনো কাজ করা সম্ভব না হলে তা–ও জানিয়ে দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্রিটিশ রাজনীতিক রুশনারা আলী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে গত ২২ জানুয়ারি এক ই-মেইলে জানায়, ‘ইউসিএল কর্তৃপক্ষ সিপ্যাপ যন্ত্র বাংলাদেশকে পাঠানোর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ করেছিল। তবে এ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা সহযোগিতার অনুরোধ পাওয়া যায়নি। এখনো এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাওয়া গেলে হাইকমিশন সম্ভাব্য সব সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।’

এ উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উচিত সময়মতো ই–মেইলের জবাব দেওয়া এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া। কোনো কাজ করা সম্ভব না হলে তা–ও জানিয়ে দেওয়া উচিত।
ইকবাল আহমদ, চেয়ারম্যান, সি মার্ক গ্রুপ

জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলো জানতে চাওয়ার পর যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা ইউসিএলের সংশ্লিষ্ট দলের এক অধ্যাপকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার আগ্রহ দেখান। জবাবে ওই অধ্যাপক তাঁকে জানান, তিনি ছয় মাস আগে বিষয়টি নিয়ে হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। উদ্যোগটি এখনো কার্যকর আছে কি না, তা খোঁজ নেওয়ার পর কথা বলবেন।

ইউসিএলএইচের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ১২০টি হাসপাতালে ১০ হাজার সিপ্যাপ ব্যবহার করছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিপ্যাপের নকশা উন্মুক্ত করার জন্য ৩ হাজার ৪৩৯টি অনুরোধ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০৫টি দেশের ১ হাজার ৯৭০টি প্রতিষ্ঠানকে নকশা সরবরাহ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন