বাংলাদেশের বিভিন্ন নাগরিক ও কোম্পানির পাচারের মাধ্যমে বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক বিশেষত সুইস ব্যাংক গোপনে জমা রাখা বিপুল অর্থ উদ্ধারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস একটি রিট আবেদন করেন। এর শুনানি নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আদালত রুলসহ আদেশ দেন। সুইচ ব্যাংকসহ দেশের বাইরে বিদেশি ব্যাংকে গোপনে পাচার করে অর্থ রাখা ব্যক্তির নাম-ঠিকানা, অর্থের পরিমাণ এবং ওই অর্থ উদ্ধারে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে বলা হয়। এর আগে গত বছরের ২২ নভেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুল দিয়ে দেশের বাইরে অর্থ পাচারে জড়িত দুর্বৃত্তদের নাম, ঠিকানা ও পাচার করা অর্থে তাঁদের বিদেশে বাড়ি তৈরিসহ বিস্তারিত তথ্য জানতে নির্দেশ দেন। দুটি বিষয় আজ একসঙ্গে শুনানির জন্য ওঠে। আর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক ওই প্রতিবেদন দাখিল করে।

আদালতে রিটের পক্ষে আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম খান, দুদকের পক্ষে আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক শুনানি করেন। শুনানিকালে আদালত বলেন, ‘আমরা চাই দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং বন্ধ হোক। সবারই দায়িত্ব আছে। শুনানি নিয়ে আদালত সোমবার পরবর্তী দিন রেখেছেন।’

এর আগে প্রতিবেদন তুলে ধরেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তাঁর ভাষ্য, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন হওয়ায় কেবল ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে উদ্ভূত (সরকারি কর্মচারীসংশ্লিষ্ট) অর্থ পাচারের অভিযোগ দুদক কর্তৃক অনুসন্ধানযোগ্য। ফলে সুইস ব্যাংকসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য তথ্য আদান-প্রদানসহ একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ অনুসৃত কৌশল পর্যালোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে একটি কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য বিএফআইইউকে অনুরোধ করা হয়েছে। বিএফআইইউ সেই আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগে অনুসন্ধানাধীন। মুসা বিন শমসেরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা মামলা বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত অনুবিভাগে তদন্তাধীন। পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসসংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের তালিকাসংবলিত প্রতিবেদন শুনানিতে তুলে ধরেন খুরশীদ আলম খান।

পানামা পেপারস বিষয়ে ১৪ নাম

প্রতিবেদনে বলা হয়, কর ফাঁকি দিয়ে নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়া, আইন অমান্য করে দেশের টাকা বিদেশে পাচার ও অবৈধ আয়ের টাকায় বৈধ ক্ষমতার মালিক হওয়া প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পানামা পেপারস শিরোনামে বিশ্বজুড়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ও আইসিআইজের ওয়েবসাইটে বর্ণিত দেশভিত্তিক তালিকা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রথম পর্বে ৪৩ ব্যক্তি ও দুটি প্রতিষ্ঠান এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৮ ব্যক্তি ও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানসহ ৬১ ব্যক্তি এবং সাতটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়।

ব্যক্তিদের তালিকায় ১৪ জনের নাম রয়েছে। তাঁরা হলেন বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী, সেতু করপোরেশনের পরিচালক উম্মে রুবানা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সিডব্লিউএন (এ) আজমত মঈন, বনানীর সালমা হক, এস এম জোবায়দুল হক, বারিধারা কূটনৈতিক এলাকার সৈয়দ সিরাজুল হক, ধানমন্ডির দিলীপ কুমার মোদি ও শরীফ জহির, গুলশানের তারিক ইকরামুল হক, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা, পরিচালক খন্দকার মঈনুল আহসান শামীম, পরিচালক আহমেদ ইসলাইল হোসেন, পরিচালক আখতার মাহমুদ।

প্রতিবেদনে দুদক বলছে, অনুসন্ধানকালে বিএফআইইউ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। এখনো চাওয়া রেকর্ডপত্র বা তথ্যাদির জবাব পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, অফশোরসহ অন্যান্য কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন বা সম্পত্তি অর্জনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য মূলত বিএফআইইউই সর্বাধিক উপযুক্ত মাধ্যম। অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঠিকতা যাচাইয়ে অর্থাৎ মূল অনুসন্ধানাধীন বিষয় তথা ওই ব্যক্তি কর্তৃক সংশ্লিষ্ট দেশে অফশোর কোম্পানি খোলা এবং তাতে বিনিয়োগ ও লেনদেনসংক্রান্ত তথ্যাদি বিএফআইইউ থেকে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে এখন পর্যন্ত যাঁদের নাম পত্রিকার মাধ্যমে পাওয়া গেছে তা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তিদের তথ্য পাওয়া গেছে, তাঁদের মধ্যে কেউই ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ নয়। মানি লন্ডারিং আইনে ২৮টি প্রেডিকেট অপরাধের মধ্যে শুধু ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে দুদক কাজ করে। অভিযোগটি দুদকের তফসিল বহির্ভূত বলে অনুসন্ধান কাজে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না।

প্যারাডাইস পেপারসে ২৯ নাম

প্রথম আলোসহ দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম তুলে ধরে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারাডাইস পেপারস নামে অর্থ পাচারসংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদের প্রথম পর্বে ১০ জন এবং দ্বিতীয় পর্বে ১৯ জনের নাম পাওয়া যায়।
প্রথম পর্বের ১০ জন হলেন মাল্টিমোড লিমিটেডের আবদুল আউয়াল মিন্টু, নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, তাবিথ আউয়াল, তাফসির আউয়াল, তাজওয়ার মো. আউয়াল; নিউইয়র্কের তাইরন পিআইএর মোগল ফরিদা ওয়াই, যুক্তরাষ্ট্রের শহিদ উল্লাহ, বনানীর চৌধুরী ফয়সাল, বারিধারার আহমাদ সামির ও মহাখালীর ব্রোমার অ্যান্ড পার্টনার্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড।

দ্বিতীয় পর্বের ১৯ জন হলেন ভেনাস ওভারসিস কোম্পানির মুসা বিন শমসের, বারিধারার ডাইনামিক এনার্জির ফজলে এলাহী, ইন্ট্রিপিড গ্রুপের কে এইচ আসাদুল ইসলাম, খালেদা শিপিং কোম্পানির জুলফিকার আহমেদ, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের তাজুল ইসলাম তাজুল, বেংগল শিপিং লাইনসের মোহাম্মদ মালেক, সাউদার্ন আইস শিপিং কোম্পানির শাহনাজ হুদা রাজ্জাক, ওসান আইস শিপিং কোম্পানির ইমরান রহমান, শামস শিপিং লিমিটেডের মোহাম্মদ এ আউয়াল, উত্তরার এরিক জনসন আনড্রেস উইলসন, ইন্ট্রিডিপ গ্রুপের ফারহান ইয়াকুবুর রহমান, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের তাজুল ইসলাম, পদ্মা টেক্সটাইলের আমানুল্লাহ চাগলা, নিউটেকনোলজি ইনভেস্টমেন্টের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান, মাল্টার মোহাম্মদ রেজাউল হক, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মোহাম্মদ কামাল ভূঁইয়া, তুহিন-সুমন, সেলকন শিপিং কোম্পানির মাহতাবা রহমান, জেমিকো ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের ফারুক পালওয়ান ও গ্লোবাল এডুকেশন সিস্টেমের মাহমুদ হোসাইন।

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে এখন পর্যন্ত পত্রিকার মাধ্যমে যাঁদের নাম পাওয়া গেছে, তা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তিদের তথ্য পাওয়া গেছে তাঁদের মধ্যে কেউই পাবলিক সার্ভেন্ট নয়। মানি লন্ডারিং আইনে ২৮টি প্রেডিকেট অপরাধের মধ্যে শুধু ঘুষ ও দুর্নীতি নিয়ে দুদক কাজ করে। অভিযোগটি দুদকের তফসিল বহির্ভূত বলে অনুসন্ধান কাজে অগ্রসর হওয়া যাচ্ছে না।