default-image

পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আজ। তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মামলাটি এখন আইনি লড়াইয়ে চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে করা মামলাটি এখনো বিচারিক আদালতের গণ্ডি পেরোয়নি।

হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ২০৪ জন আসামি পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেছেন। খালাস পাওয়া ও সাজা কমা ৮৩ আসামির ক্ষেত্রে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এখন এসব আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায়। দেশের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি সবচেয়ে বড় মামলা এটি।

রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আগামী মাসে লিভ টু আপিল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। অবশ্য আসামিপক্ষের মতে, আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়া ও প্রস্তুত হওয়া সাপেক্ষে চলতি বছর আপিল ও লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা কম।  

মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে একাধিক আইনজীবী বলেছেন, আপিল দায়েরের পর সাধারণত সংক্ষুব্ধ পক্ষ অপর পক্ষকে আপিলের সংক্ষিপ্তসার সরবরাহ করে থাকে। লিভ টু আপিলের ক্ষেত্রে আদালতে শুনানি হয়ে থাকে। সংক্ষুব্ধ পক্ষের লিভ টু আপিল মঞ্জুর হলে নিয়মিত আপিল হিসেবে তা রূপান্তরিত হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষে আপিলের ওপর শুনানি হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

আজ থেকে এক যুগ আগে, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর (বর্তমান নাম বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ করেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু সদস্য। তাঁরা পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালান। নিষ্ঠুর আচরণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন সামরিক কর্মকর্তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরাও। দুই দিনব্যাপী ওই বিদ্রোহ শেষে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

default-image

নৃশংস ওই হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় দেন বিচারিক আদালত। ‘পিলখানা হত্যা’ মামলা হিসেবে পরিচিত ওই মামলায় আসামি ছিলেন ৮৫০ জন। বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। আর খালাস পান ২৭৮ জন।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে অনুমোদনের জন্য আসে। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২২৮ জনকে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ অন্যরা খালাস পান।

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর গত ডিসেম্বর ও চলতি বছর রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করে।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ গত ডিসেম্বরে লিভ টু আপিল দায়ের করেছে। আসামিপক্ষ সরাসরি কয়েকটি আপিল ও লিভ টু আপিল দায়ের করেছে। লিভ টু আপিল শুনানির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। লিভ টু আপিলগুলো আগামী মাসে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা সাবেক ডিএডি সৈয়দ তৌহিদুল আলমসহ দণ্ডপ্রাপ্ত সাড়ে তিন শর বেশি আসামির আইনজীবী ছিলেন মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেওয়া ও আপিল প্রস্তুত হওয়া সাপেক্ষে চলতি বছর আপিল ও লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে

বিস্ফোরক আইনে করা মামলার বিচার এক যুগেও শেষ হয়নি। এ মামলায় ১ হাজার ৩৪৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৮৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ২৩ ও ২৪ মার্চ সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। বিচারকাজ চলছে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী এজলাসে। এ মামলায় আসামি ৮৩৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৩৩ আসামি ইতিমধ্যে মারা গেছেন এবং ২০ আসামি পলাতক। ৭৮১ আসামি কারাগারে আছেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, মামলাটির নিষ্পত্তি কবে হবে, তা অনিশ্চিত। হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে ২৭৮ জন খালাস পেলেও বিস্ফোরক মামলায় আসামি থাকায় তাঁরা বের হতে পারেননি।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে বিচারকাজ স্থগিত ছিল। বছরের শেষভাগে আবার কার্যক্রম শুরু হয়, যা চলমান আছে। চলতি বছরেই মামলাটি নিষ্পত্তি হতে পারে বলে আশা করেন তিনি।


বিদ্রোহের বিচার

এ ছাড়া বিডিআরে বিদ্রোহের ঘটনায় বিচার হয় অধিনায়কদের সামারি ট্রায়ালে (সংক্ষিপ্ত বিচার)। তাতে ১০ হাজার ৯৭৩ জনের বিভিন্ন ধরনের সাজা হয়। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার ৭৫৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অন্যরা প্রশাসনিক দণ্ড শেষে আবার চাকরিতে যোগ দেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে সারা দেশে বিশেষ আদালত গঠন করে বিচার করা হয়। বিশেষ আদালতে ৫৭টি মামলায় ৫ হাজার ৯২৬ জন জওয়ানের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। বিচার চলার সময় মারা গেছেন ৫ জন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন