ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বের বার্তা ওয়াশিংটনের
এশিয়ায় চীনের ভূমিকা নিয়ে সতর্ক যুক্তরাষ্ট্র
default-image

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বেশ কিছুদিন ধরেই চিন্তিত করে তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের সংঘাত, কোভিড-১৯ মহামারিকে নিয়ে চীনের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে। স্বভাবতই মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের ভারত ও বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের গুরুত্বের বার্তা দেবে সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকট প্রতিবেশী দেশে স্টিফেন বিগানের এই সফর অনেককে কৌতূহলী করে তুলেছিল।
ঢাকা সফরের দ্বিতীয় দিনে বৃহস্পতিবার বিকেলে কোনো রাখঢাক না রেখেই স্টিফেন বিগান বললেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সহযোগিতার উদ্যোগ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে (আইপিএস) বাংলাদেশকে দেখতে আগ্রহী। আইপিএস নিয়ে তিনি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। আমার বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে সম্পর্কটাকে যুক্তরাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে সেই বার্তা দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন দিনের ভারত সফর শেষে গত বুধবার বিকেলে ঢাকায় আসেন। প্রথম দিন সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
স্টিফেন বিগান বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মীর সঙ্গে তাঁর বাংলাদেশ সফরের প্রতিপাদ্য আর দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই) বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র আইপিএসে যোগ দিতে ২০১৮ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়ে আসছে। গত পৌনে দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় বিষয়টি বলছে। সবশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। সেই আলোচনাতেও মার্ক এসপার আইপিএস নিয়ে কথা বলেন। ওয়াশিংটন যেহেতু ২০১৮ থেকেই প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা বলছে সংগত কারণেই স্টিফেন বিগানের ঢাকা সফরে বিষয়টি আলোচনাতে আসাটা স্বাভাবিক।

বৃহস্পতিবার সকালে স্টিফেন বিগানের সঙ্গে আলোচনার পর আইপিএস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি বলেছে জানতে চাইলে আবদুল মোমেন বলেন, উনি আইপিএস নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমার সঙ্গে আইনের শাসন, রোহিঙ্গা সমস্যা, বিনিয়োগ, বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত পাঠানো এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অবশ্য আগের দিন অর্থাৎ বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শাহরিয়ার আলমও জানিয়েছিলেন, আইপিএসের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসেনি।
ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) বা ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন (আইপিভি) নিয়ে কি আলোচনা হয়েছে রাজধানীর একটি হোটেলে প্রথম আলোর এই প্রশ্নের জবাবে বিগান বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কীভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে।’

বিজ্ঞাপন

মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, এটা শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক নয়। এখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এটা হচ্ছে এশিয়া আর প্রশান্ত মহাসাগরের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একটি সহযোগিতার মোর্চা। এখানে একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য এখানকার দেশগুলোর সদিচ্ছা থাকতে হবে।
চীনের নাম উল্লেখ না করলেও দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র এশিয়া জুড়ে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সংঘাত আর উত্তেজনা যে এশিয়া আর প্রশান্ত মহাসাগরের দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে সেটা তিনি উল্লেখ করেন। স্টিফেন বিগান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। আমি এখানে বিশেষ কারও কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এই সব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে।’

ওয়াশিংটন যে আইপিএসকে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে দেখতে চায় তা নিয়ে কোনো রাখঢাক করেননি তিনি। স্টিফেন বিগান বলেন, ‘আইপিএস হচ্ছে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার একটি রূপকল্প। এটা কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার জন্য হয়নি। বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই এই কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি ভারত আর বাংলাদেশে এলেন। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এ মাসের শেষে আসছেন শ্রীলঙ্কায়। তার মানে কি যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে? গতকালের মত বিনিময়ে এই প্রতিবেদকের প্রশ্নটির উত্তরে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি নির্বাচনের আগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলাম তা অর্জিত হয়েছে।’ তিনি জানালেন এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক আলোচনার জন্য তিনি সফর করছেন। তারপর ভারত, শ্রীলঙ্কা আর মালদ্বীপ সফরে আসছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।
স্টিফেন বিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে বড় পরিসরে দেখতে চায়। অনেক দিন ধরেই অধিকাংশ কৌশল থেকে বাদ রাখা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে। অ্যাপেকসহ অনেক আঞ্চলিক জোটের বাইরে থেকেছে এ অঞ্চলের দেশগুলো। এ নিয়ে এ অঞ্চলের সবগুলো দেশের সঙ্গে কর্মকর্তা পর্যায়ে তো বটেই নেপথ্যে থেকেও অনেক আলোচনাতেও বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কথাবার্তা চলছে।
তিন দিনের সফর শেষে স্টিফেন বিগানের আজ শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে ওয়াশিংটন যাত্রার কথা রয়েছে।

যৌথ সংবাদ সম্মেলন
এর আগে সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে আলোচনার পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্টিফেন বিগান বলেন, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠায় তারা এই সহযোগিতা আরও বাড়াতে আগ্রহী। এই অঞ্চলে তাঁদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে স্টিফেন বিগানের ঢাকা সফরের তাৎপর্য জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের অভাবনীয় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, স্থিতিশীলতা, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান—এসব কারণ মিলিয়ে তারা (যুক্তরাষ্ট্র) সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে জোর দিচ্ছে।’
সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে স্টিফেন বিগান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকর্ষণীয় অংশীদার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বাইরের পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের কারণ দীর্ঘ সময় ধরে এখানকার স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এখানকার ভোক্তাদের সংখ্যা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীর উপস্থিতি।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা সংকট
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন স্টিফেন বিগান। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। শুধু ওই জনগোষ্ঠীকে সহায়তাই নয়, বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়, সে জন্য সমস্যার উৎসে গিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান কীভাবে করা যায়, এই লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যা সমাধানের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে।’
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করবেন কি না? জানতে চাইলে স্টিফেন বিগান বলেন, এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। অবশ্যই এটা একা বাংলাদেশের সমস্যা নয়। যে উদারতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে, সেটা অনন্য। সমস্যাটি সারা বিশ্বের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাই ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিটি প্রধান দেশের অভিন্ন সুরে উচ্চকণ্ঠ হয়ে সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে বলা উচিত।
বঙ্গবন্ধুর খুনিকে ফেরত
বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে স্টিফেন বিগান বলেন, ‘এটি একটি আইনি বিষয়। আর এটা পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আওতায় নয়। আমাদের সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্থাগুলো বিষয়টি দেখছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথাও হয়েছে। এটি যে পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে, সেটিও তাঁকে জানিয়েছি।

মন্তব্য পড়ুন 0