default-image

কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে সমতল ও পাহাড়—সবখানেই আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে। আদিবাসীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষেত্রে সরকারি বাহিনী ও সরকারি দলের লোকজনও জড়িত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং এর ওপর লিখিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে গতকাল শুক্রবার। রাজধানীতে দ্য ডেইলি স্টার ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ ও বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর (২০১৪ সাল) অন্তত আটজন আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় সাতজন আদিবাসী নারীকে। এ সময় ১২৬ জন আদিবাসীকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৫৪টির বেশি আদিবাসী ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। আতঙ্কে বান্দরবানের ১৫০টি পরিবারের প্রায় ৫০০ মানুষ মিয়ানমারে চলে গেছেন। আর সমতলের ৬০টি পরিবারের ৩০০ ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। ধর্মীয় উপাসনালয়ে আক্রমণ ও আদিবাসী শিশুদের ধর্মান্তরিত করার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সমতলের ১০২টি আদিবাসী পরিবার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। পাহাড় ও সমতল মিলে উচ্ছেদের হুমকিতে রয়েছে ৮৮৬টি পরিবার। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ৩ হাজার ৯১১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আরও প্রায় সাড়ে ৮৪ হাজার একর জমি জবরদখল ও অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াধীন।
প্রতিবেদন অনুসারে, নাটোরের সিংড়ায় চৌগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতা ওঁরাও সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় জড়িত। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের একজন নেতা ও একজন সাংসদের বিরুদ্ধে বান্দরবানে আদিবাসীদের ভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে।
আদিবাসী নারী ও শিশুদের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ১২২ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৩ সালে সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন ৬৭ জন। গত বছর সব মিলিয়ে ধর্ষণের শিকার হন ২১ জন।
প্রতিবেদনে ইতিবাচক দিক হিসেবে বলা হয়, গত বছর মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা পার্বত্য তিন জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আদিবাসীদের মাতৃভাষা নিয়ে সরকার জরিপ শুরু করেছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, সরকার বলছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু আদতে বাস্তবায়িত হয়েছে ২৫টি। যেসব ধারা বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো বাস্তবায়িত না হলে আদিবাসীরা সুফল পাবেন না। তিনি বলেন, এখনো আদিবাসীদের ওপর নির্যাতনের বিচার হয় না। এমনকি আদিবাসীদের হয়ে কথা বললে হামলার শিকার হতে হয় এবং এর বিচার পাওয়া যায় না। আসলে আদিবাসীদের লড়াই হচ্ছে এ দেশের সব অধিকারহীন ও নিপীড়িত মানুষের লড়াই। এতে সবাইকেই শামিল হতে হবে।
সাংসদ হাজেরা সুলতানা বলেন, সরকার পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের নামে চটকদার অনেক কিছু করছে। কিন্তু এগুলো আদিবাসীদের লাভের বদলে তাঁদের অধিকার হরণ হচ্ছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশ নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের আরও বিপন্ন করে তোলে।
কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, ২০১৫ সালেও যে হিসাব আসছে, সেটাও বেশ উদ্বেগজনক।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন চৈতালী ত্রিপুরা। প্রতিবেদনের সারাংশ পড়েন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন