গণিত শেখো স্বপ্ন দেখো: জাতীয় গণিত উৎসব বিশেষ সংখ্যা: ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

আনন্দ উৎসবের গণিত

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রবেশমুখ দিয়ে ঢুকতেই ঢোলের আওয়াজে গণিতের জয়ধ্বনি। মন আর হূদয় নেচে ওঠে।
ততক্ষণে সকালের রঙিন ঝলমলে মিষ্টি আলো ইট-পাথরের উঁচু ভবনের ফাঁক দিয়ে এসে মাঠে খেলা করছে। অন্যদিকে গণিতকে জয় করতে সারা দেশ থেকে আসা হলুদ টি-শার্ট পরা সহস্র খুদে গণিতবিদের আনাগোনায় পুরো উৎসব প্রাঙ্গণ আনন্দ-উৎসাহে ভরপুর।
রাজধানী ঢাকার সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি বসেছিল ‘ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো জাতীয় গণিত উৎসব-২০১৪’ এবং বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের ১২তম আসর। বিপুলসংখ্যক অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা, উৎসবের স্বেচ্ছাসেবক, বন্ধুসভার বন্ধু, দেশবরেণ্য গণিতবিদ, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং সর্বোপরি উৎসবের শুভানুধ্যায়ী উপস্থিত হয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় গণিত মেলায়। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম আলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় গণিতের এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

default-image

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য
আগামী জুলাই মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠেয় ৫৫তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) জন্য বাংলাদেশ গণিত দলের সদস্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ২২টি জেলায় আঞ্চলিক গণিত উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ২২টি আঞ্চলিক উৎসবে সরাসরি অংশ নেওয়া প্রায় ২৫ হাজারের মধ্যে এক হাজার ৫৫ জন অর্জন করে জাতীয় উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ। এর মধ্যে ৮৭৬ জন খুদে গণিতবিদ হাজির হয় গণিতের এই মহাযজ্ঞে। জাতীয় উৎসবের বিজয়ীদের মধ্য থেকে একাধিক ক্যাম্পের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বাংলাদেশ দল।
রংবেরঙের সাজে উৎসব প্রাঙ্গণ
নানা কারুকাজ আর বড় হরফে ‘জাতীয় গণিত উৎসব-২০১৪’ লেখা প্রবেশপথ। ফটক পেরিয়ে একটু এগোলেই হাতের বাঁ পাশে সব আঞ্চলিক উৎসবের বিজয়ীদের ছবি নিয়ে সাঁটানো বিশাল ব্যানারে আঞ্চলিক উৎসবের বিজয়ীরা নিজেদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। ছবি তোলা তো আছেই।
আরও একটু সামনে গিয়ে বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে দেখা গেল ১২টি ফ্রেমে দাঁড় করানো গণিতের ১২ বছরের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি। এরপরই বিশাল মাঠ। মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে শামিয়ানা। এর নিচে শত শত চেয়ার আর এক পাশে গণিতের বিভিন্ন চিহ্ন দিয়ে সাজানো মঞ্চ। মাঠের পশ্চিম পাশে ২২টি আঞ্চলের জন্য ২২টি বুথ, উত্তর পাশে গাছের নিচে এবং পূর্ব পাশে ছিল বইমেলাসহ বিভিন্ন সংগঠনের স্টল। এ ছাড়া মাঠের চারপাশজুড়ে উড়ছিল লাল-নীল গণিতের পতাকা, ফেস্টুন ও ব্যানার। তবে শিক্ষার্থীদের ভিড় ছিল আইএমওতে পদক বিজয়ী সাতজনের সঙ্গে ছবি ওঠানোর জন্য বানানো বিশেষ বোর্ড এবং গণিত উৎসবের লোগো দিয়ে বানানো বোর্ডের দিকে।

default-image

আনন্দ-উল্লাসে উদ্বোধনী
শুরুতেই শিক্ষার্থীরা নিজ অঞ্চলের বুথে নাম নিবন্ধন করে সংগ্রহ করে রেজিস্ট্রেশন নম্বরযুক্ত উৎসবের পরিচয়পত্র এবং মাথায় বাঁধার জন্য লাল-সবুজের ব্যান্ডেনা। গণিত মানেই শৃঙ্খলা। আর তাই মাইকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য নিজ অঞ্চলের প্ল্যাকার্ডের নিচে লাইনে দাঁড়ানোর ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে সবাই। জাতীয় সংগীতের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উঠিয়ে উৎসবের শুরু। পরে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা এবং শত শত বেলুন উড়িয়ে সূচনা হয় গণিতের এই মহোৎসবের।
উৎসাহ ও প্রত্যাশার গণিত অলিম্পিয়াড
উদ্বোধন শেষে মাঠ থেকে পরীক্ষাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় সব শিক্ষার্থীকে। সকাল ১০টা। ঢং ঢং ঢং। শুরু হলো দ্বাদশ বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড (পরীক্ষা পর্ব)। প্রাইমারি ক্যাটাগরি দুই, জুনিয়র তিন এবং সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি চার ঘণ্টার গণিতজয়ের এই পর্বে অংশ নেয় পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের যত উদ্বেগ, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ অভিভাবকদের। অনেক অভিভাবক টেনশনে অস্থির হয়ে আয়োজকদের কাছে জানতে চান, পরীক্ষার প্রশ্ন সোজা হয়েছে, না কঠিন?

default-image

নানা আয়োজনে রঙিন উৎসব
পরীক্ষা শেষে মধ্যাহ্নভোজ ও নামাজের বিরতির পর মাঠের উত্তর কোণে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সহযোগিতায় জল-রকেট উৎক্ষেপণের আয়োজন করা হয়। বিপুল উৎসাহ ও করতালিতে এক এক করে আকাশে ছোড়া হয় ৮ থেকে ১০টি জল-রকেট। তারপর শুরু হয় চমক পর্ব। মঞ্চে আসেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মোহম্মদ কায়কোবাদ, গণিতবিদ লুৎফুজ্জামান, এভারেস্ট বিজয়ী মুসা ইব্রাহীম, বিজ্ঞানী এফ আর সরকার ও বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ দাবারু ফিদে মাস্টার ফাহাদ রহমান।
শুভেচ্ছা, গল্প, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা অতিথিরা জানান শিক্ষার্থীদের। মঞ্চ থেকে অতিথিদের নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় সুডোকু মেলানোর প্রতিযোগিতা। প্রথমবারের মতো আয়োজন করা এই প্রতিযোগিতা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। বিজয়ী ঘোষণা করা হয় তিনজনকে। বিকেল তখন প্রায় সোয়া চারটা। মঞ্চ চলে যায় খুদে গণিতবিদদের দখলে। উৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নানা পরিবেশনার মাধ্যমে জানিয়ে দেয় শুধু গণিত নয়, নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তিতেও সমান পারদর্শী তারা। এ ছাড়া গণিত ও বিজ্ঞানের বইয়ের স্টল থেকে প্রিয় বইটি কেনা কিংবা প্রিয় লেখক, গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীর কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়াসহ নানা কাজে ব্যস্ত ছিল শিক্ষার্থীরা।
ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের গান
সকাল নয়টায় শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের উৎসব। শুরুতেই বুথ থেকে সব শিক্ষার্থীর হাতে বেঁধে দেওয়া হয় রঙিন ফিতা। মঞ্চে শুরু হয় বন্ধুসভার পরিবেশনায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ গান দিয়ে ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের গান। তার আগে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রী হলে তারা কী করবে?
তারপর মঞ্চে ওঠে খুলনার সামাজিক সংগঠন ‘রূপান্তর থিয়েটারের’ শিল্পীরা। পটে আঁকা ছবি সঙ্গে নেচে-গেয়ে বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডের শুরু, লক্ষ্য, অর্জন ও পথচলা নিয়ে পরিবেশন করে গণিত পটগান। পাঁচ বছর ধরে এই পটগান বিমোহিত করছে সবাইকে। পটের পর হয় রুবিক কিউব প্রতিয়োগিতা। আগের ২২ সেকেন্ডের জাতীয় রেকর্ড ভেঙে ১৮ সেকেন্ডে রুবিক মিলিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় হাসান জহিরুল ইসলাম।

default-image

নতুন যত পুরস্কার
এবার গণিত অলিম্পিয়াডে নতুন করে আরও যুক্ত হয় চারটি পুরস্কার। প্রাইমারি ক্যাটাগরিতে মেয়েদের মধ্যে সেরার জন্য জেবুন্নেসা হাশেম পুরস্কার, জুনিয়র ক্যাটাগরির তৃতীয়র জন্য প্রকৌশলী লুৎফুর রহমান স্মৃতি পুরস্কার, সেকেন্ডারিতে তৃতীয়র জন্য গৌরাঙ্গ দেব রায় স্মৃতি পুরস্কার এবং সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি ক্যাটাগরির মধ্যে সবার সেরার জন্য জামাল নজরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার। এ ছাড়া হাফিজা খাতুন স্মৃতি একটি বিশেষ পুরস্কারও ছিল।
ফলাফল ঘোষণা ও গণিতজয়ের হাসি
প্রতিদিন অন্তত একবার মাকে খুশি করবে, না বুঝে মুখস্থ করবে না, ভালোবাসবে দেশকে, দূরে থাকবে মাদক থেকে —এমন অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হয় সমাপনী পর্ব। মোট ৮১ জনকে বিজয়ী ঘোষণা করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সনদ ও মেডেল। পরিয়ে দেওয়া হয় লাল টি-শার্ট।
চার ক্যাটাগরির সেরা চারজনসহ বিশেষ পুরস্কার পাওয়া মোট ১৩ জনকে দেওয়া হয় বিশেষ ক্রেস্ট ও বিভিন্ন মূল্যমানের অর্থ। আরও দেওয়া হয় সেরা গণিত ক্লাব, আজীবন সম্মাননা, ভেন্যু প্রতিষ্ঠান এবং অঞ্চলিক উৎসবের আয়োজকদের শুভেচ্ছা স্মারক। অতিথিদের সঙ্গে মঞ্চে ডাকা হয় জাতীয় অলিম্পিয়াডে বিজয়ী সবাইকে। চলতে থাকে ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক। খুদে গণিতবিদদের সবার চোখে-মুখে ভাসছিল নতুন কিছু শেখার আনন্দ, গণিতজয়ের হাসি...

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন