default-image

হো চি মিন ইসলাম ও তাসনুভা আনান (শিশির)। ভিন্ন দুই জেলার বাসিন্দা হলেও অনেক কিছুতেই মিল। শারীরিক ও মানসিক গঠনে তাঁরা অভিন্ন, যাকে এ সমাজ ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বলে। তাঁদের উচ্চশিক্ষার পথটাও এখন মিলে গেছে। দুজনেই এখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এমন এক বিষয়ে তাঁরা পড়ছেন, যা নিজ সম্প্রদায়ের তো বটেই, দেশের সেবার সুযোগ করে দেবে।

হো চি মিন ও তাসনুভা এই পর্যায়ে এসেছেন অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে। লম্বা সেই কাহিনিতে প্রবেশের আগে জানা যাক তাঁদের উচ্চশিক্ষার নতুন পথের কিছু তথ্য। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ। সেখানে পড়ানো হয় জনস্বাস্থ্যের ওপরে আন্তর্জাতিক মাস্টার্স। এই বিষয়ে গত ২৪ জানুয়ারি থেকে পড়ছেন হো চি মিন ও তাসনুভা। তাঁরাসহ মোট শিক্ষার্থী ৪৭ জন। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের নাগরিক এই শিক্ষার্থীরা। হো চি মিন ও তাসনুভা ভর্তি হয়েছেন ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরিত নারী পরিচয়ে। ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম শিক্ষার্থী তাঁরা।
এখন অনলাইনে ক্লাস করেছেন হো চি মিন ও তাসনুভা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন নিজেরাই। এরপর থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের শুভেচ্ছায় ভাসছেন। ৩০ জানুয়ারি দুপুরে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এই দুই শিক্ষার্থী।

কোর্সটির সহকারী সমন্বয়কারী তাহসিন মাদানী হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এবারের ব্যাচটি ১৭তম। ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে এই কোর্সে হো চি মিন এবং তাসনুভাই প্রথম। তাঁরা লিখিত, মৌখিক পরীক্ষাসহ প্রতিটি ধাপেই খুব ভালো করেছেন। হো চি মিনের নার্স হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তাসনুভা সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত। আন্তর্জাতিক কোর্সটি বেশ ব্যয়বহুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার অনলাইনে ক্লাস হওয়ায় কোর্সের খরচ অনেক কমানো হয়েছে। আছে বিভিন্ন স্কলারশিপ। তাই খরচটা হো চি মিন এবং তাসনুভার হাতের নাগালেই থাকছে।

বিজ্ঞাপন

অবিরাম সংগ্রাম হো চি মিনের

হো চি মিন নামটা কে না জানেন? ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম হো চি মিন ইসলাম রেখেছিলেন বাবা। শারীরিক গঠনে ছেলেই ছিলেন হো চি মিন। তবে মনটা ছিল এক নারীর। ধীরে ধীরে নারীতে রূপান্তরিত হয়েছেন তিনি। তবে বাবার রাখা নামটি পরিবর্তন করেননি। বিপ্লবী নামটা শুধু ধারণ করেই রক্ষা পাননি হো চি মিন। তাঁকে পদে পদে বিপ্লব করে এই পর্যায়ে আসতে হয়েছে। আলাপচারিতায় জানা গেল তার আদ্যোপান্ত।

কদিন আগেও হো চি মিনের পরিচয়টা ছিল ভিন্ন। তিনি ছিলেন রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবন্ধিত নার্স। দুই বছর কাজ করেছেন কার্ডিয়াক আইসিইউতে। করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। নার্সিং পেশাতে হো চি মিন ঢুকেছিলেন সরাসরি ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়েই। তিনি বললেন, ‘স্কয়ার হাসপাতালে আমার বিভাগের সবাই জানতেন আমি ট্রান্সজেন্ডার। কিন্তু সবাই আমাকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, কাজের সুযোগ দিয়েছেন।’

আন্তর্জাতিক মাস্টার্স করতে স্কয়ার হাসপাতালের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন হো চি মিন। কোর্সটির জন্য স্কলারশিপ বা বৃত্তি দিচ্ছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। তবে দৈনন্দিন খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। এত দিন পেয়েছেন ভালো বেতন; ছিলেন ভালো একটা বাসায়। সবকিছু মিলিয়ে জীবন অনেকটাই গোছানো ছিল হো চি মিনের। পড়াশোনার জন্য এখন আবার সব নতুন করে শুরু করতে হবে তাঁকে।
হো চি মিন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে পথ আজকে আমি আর তাসনুভা তৈরি করলাম, সেই পথে নিশ্চয়ই আরও অনেক হিজড়া, কোতি, ট্রান্সজেন্ডার, যৌনকর্মী ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ আসবে। যখন তারা আসতে শুরু করবে, আসল পরিবর্তনটা ঠিক তখনই ঘটবে।’

বগুড়ায় জন্ম ও পড়াশোনা হো চি মিনের। নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘শুধু দেহ দিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয় না। আমার শরীরটা ছিল ছেলের। আমার মন-মগজ বলত আমি নারী। সমাজে ছেলে বা মেয়ে নয়, এমন একটি শিশুর প্রতি যে অত্যাচার তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি। স্কুলের কেউ আমাকে মানুষ মনে করত না। স্কুলকে মনে হতো একটা টর্চার সেল। তবে মাজহার হোসেন নামের এক শিক্ষকের কাছ থেকে প্রথম স্বপ্ন দেখা শুরু করি। সেই ছোট বয়সে বিচারক হতে চাইতাম, শুধু আমার প্রতি যে অনাচার হয়েছে, তার বিচার করার জন্য।’

বয়ঃসন্ধির সময় নিজের শারীরিক পরিবর্তন দেখে ভয় পেতেন হো চি মিন। আয়নায় নিজেকে দেখে কান্নাকাটি করতেন। দাড়ি বা পুরুষালি শরীর কোনোভাবেই মেনে নিতে পারতেন না। চার বছরের নার্সিং কোর্স শুরু করেন তিনি। কিন্তু তিন মাসের মাথায় বাবা মারা যান। তখন বুঝতে পারেন, তাঁর মাথার ওপরের ছাদটা আর নেই। নানা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চার বছরে আটবার অধ্যক্ষের কাছে গিয়ে বলেছেন, নার্সিং কোর্সটা আর করতে পারবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত নিজে উপার্জন করে কোর্সটা সম্পন্ন করেন হো চি মিন।

কামাল নামের ছেলেটিই এখন তাসনুভা

কামাল হোসেন নামের ছেলেটার ডাকনাম ছিল ‘শিশির’। শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে তাসনুভা আনানে রূপান্তরিত করেছেন তিনি। হরমোন থেরাপি, মানসিক থেরাপিসহ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে ভারতের কলকাতায় গিয়ে অস্ত্রোপচারও করিয়েছেন। পরিবার, সমাজ সহজে মানবে না, এসব মেনে নিয়েই জীবনটা চালিয়ে নিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করে জীবনসংগ্রামে টিকে আছেন তাসনুভা। এইচএসসি পাসের পর থেকে তাসনুভার আসল লড়াই শুরু। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও নিয়মিত অর্থের জোগানের নিশ্চয়তা ছিল না।
তাসনুভার বাড়ি বাগেরহাটে। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায়। সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে বটতলা থিয়েটার দলের সদস্য। ছোটবেলা থেকেই নাচতেন তাসনুভা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও কাজ করেছেন।

default-image

তাসনুভা বললেন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্যে আন্তর্জাতিক মাস্টার্সের বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি আবেদন করেন। ভর্তির আবেদন ফরমে জেন্ডারের ঘরে ছিল নারী বা পুরুষ। কিন্তু তিনি আলাদা ঘর তৈরি করে নেন। সেখানে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ লিখে টিক চিহ্ন দেন। পরে নারী বা পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো ঘর না রাখায় দুঃখ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ। তাসনুভার মতে, এটাও একটা ইতিবাচক দিক; পরিবর্তনের নতুন মাত্রা।

বিজ্ঞাপন

দুজনের ভাবনা

ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় নিয়ে হো চি মিন ও তাসনুভার নিজস্ব ভাবনা আছে। তাঁদের কথা, ট্রান্সজেন্ডার একটি সামাজিক শব্দ। জন্মের সময়ের দৈহিক গঠনের সঙ্গে হরমোনের গঠনের মিল নেই। এটাকে বলা যায়, ভুল শরীরে ভুল মানুষের জন্ম। সামাজিক প্রক্রিয়া এবং চিকিৎসাবিদ্যার মিশেলে নতুন একটি মানুষের জন্ম হয়। আসলে ব্যক্তি নিজেকে কোন পরিচয়ে পরিচিত করতে চান, সেটাই বড় কথা।

তাসনুভা দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। শিগগিরই শুটিং শুরু হবে। পাশাপাশি মডেলিংও করেন। সব ছাপিয়ে তিনি নিজের সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করতে চান। এ ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের কোর্সটি তাঁর জন্য বড় সহায়ক হবে মনে করছেন তিনি।

একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে হো চি মিনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সমন্বিত কিছু নেই। অথচ এ ধরনের মানুষগুলোর আছে বিশেষ চাহিদা। সারা পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও বদলাতে হবে। তাঁর মতো বিশেষ চাহিদার মানুষগুলোর জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন