সরকার প্রায় দুই বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন পুনর্গঠন করেছে। কিন্তু ২০০১ সালে প্রণীত ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন এখনো সংশোধন না করায় আগের কমিশনগুলোর মতো এটির কার্যকারিতা নিয়েও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হককে গত ৭ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান নিয়োগ করে সরকার ওই কমিশন পুনর্গঠন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে প্রণীত ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ অনুযায়ী তিন বছরের জন্য তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান হলেন।
কমিশনের সূত্র জানায়, নতুন চেয়ারম্যান ১৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে বসেন। সেদিন তিনি কমিশনের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানান। তিনি কমিশনের সভা অনুষ্ঠানের বিষয়েও কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা অন্যতম।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, জেএসএসের সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের অন্যতম সদস্য, সে হিসেবে কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। সন্তু লারমা চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের সভা করে লাভ হবে না। কারণ, ত্রুটিপূর্ণ আইনের ভিত্তিতে কমিশনের কাজ তাঁরা মানবেন না।
পাঁচ সদস্যের কমিশনের অন্য চার সদস্য হচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সার্কেলপ্রধান (যখন যে এলাকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির কাজ চলবে, তখন সেই এলাকার সার্কেলপ্রধান সদস্য থাকবেন), চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।
সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, ভূমি কমিশন কার্যকর না হওয়ার প্রধান কারণ ২০০১ সালে প্রণীত ভূমি কমিশন আইনের সংশোধন না হওয়া। আইনটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী জেএসএসের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। পরে জেএসএস চুক্তির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ আইনটির ২৯টি সংশোধনী দাবি করে। একাধিক সরকারের মেয়াদে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৩টি সংশোধনীর বিষয়ে সরকার ও জেএসএস প্রায় দুই বছর আগে অনেকটাই একমত হয়। কিন্তু এখনো আইনটি সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়নি।
এর আগে বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে পুনর্গঠিত কমিশনও কার্যকর হতে পারেনি আইন সংশোধন না হওয়ায়। বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, আইন সংশোধন সরকারের বিষয়। সে জন্য কমিশন অকার্যকর থাকতে পারে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ীই কমিশন কাজ করবে। এরপর তিনি ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে যাঁদের ভূমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে, তা নিষ্পত্তির জন্য তাঁদের কাছে আবেদন আহ্বান করেন। প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন পড়লেও ওই কমিশন একটিরও নিষ্পত্তি করতে পারেনি। ভূমি জরিপের উদ্যোগও সফল হয়নি।
ওই কমিশনের মেয়াদ ২০১২ সালের ১৮ জুলাই শেষ হয়। তারপর কমিশন অকার্যকর ছিল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর থেকে এর আগে তিনটি কমিশন গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়। কিন্তু কোনোটিই কার্যকর হয়নি। ১৯৯৯ সালের ৩ জুন গঠিত প্রথম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী কার্যভার গ্রহণের আগেই মারা যান। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল পুনর্গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুল করিম কার্যভার গ্রহণের কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন।
২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মাহমুদুর রহমান ২০০৭ সালে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত আইনের সংশোধন নিয়ে জেএসএসের বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেননি।