default-image

গোপালগঞ্জের শেখ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের গাড়ি নিয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে যাতায়াত করেন। আর প্রায় প্রতি যাত্রাতেই ভুগতে হয় ‘ভিআইপি সমস্যায়’। শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ আসেন। আসার পথে শিমুলিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার জন্য তাঁকে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়। তখন সাধারণ মানুষের গাড়িগুলো সার বেঁধে অপেক্ষা করলেও ভিআইপিদের গাড়িগুলোকে পটাপট ফেরিতে উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। পুলিশ, আনসার ও ঘাটের কর্মীরা ভিআইপিদের এ সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ঘাটের নিয়ম সব যানবাহন সিরিয়াল মেনে ফেরিতে উঠবে। কিন্তু ভিআইপিরা এসব সিরিয়ালের ধার ধারেন না। তাঁদের গাড়ি ডাইরেক্ট ফেরিতে উঠে যায়। আর আমরা আমজনতা আইন মেনে লাইনে পড়ে থাকি। এক লাইনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা চলে যায়। লম্বা ছুটি থাকলে ভিআইপি অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। তখন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও অপেক্ষায় থাকতে হয়।’

ঘাটে ফেরি পারাপারে এসে সিরাজুল ইসলামের মতো এমন দুর্ভোগের শিকার হন অসংখ্য যাত্রী। ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই রাতে সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মণ্ডলের গাড়ির অপেক্ষায় তিন ঘণ্টা ফেরিঘাটে বসে থাকায় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে কিশোর তিতাস ঘোষের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গঠিত হয় তিনটি তদন্ত কমিটি। তিতাসের মৃত্যুর কয়েক দিন পরেই বিআইডব্লিউটিসি ঘাটের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বদলি করা হয়। তখন ফেরিঘাটের কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ঘাটে কোনো ভিআইপি প্রথা থাকবে না। তবে সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন কখনোই হয়নি। জনপ্রতিনিধি, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সরকারি দলের নেতা-পাতিনেতারাও ভিআইপি সুবিধা ভোগ করে আসছেন। সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের বহরের সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ফেরিতে ওঠা দুই যাত্রীকে বেদম পিটুনি দেওয়ার ঘটনায় ফেরির ভিআইপি প্রথা আবারও আলোচনায় এসেছে।

বিজ্ঞাপন

বিআইডব্লিউটিসি ঘাট কর্তৃপক্ষ জানায়, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌপথে ১৯টি ফেরি চলাচল করত। তবে বর্তমানে ১৬টি ফেরি সচল আছে। এর মধ্যে কর্ণফুলি নামে একটি ছোট ফেরি অলিখিতভাবে ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ। এই ফেরিতে ছোট ছয়টি গাড়ি বহন করা হয়। অন্য ফেরির তুলনায় এটির গতিও বেশি। শিমুলিয়া ঘাটের বিআইডব্লিউটিসির এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর্ণফুলী ফেরিটি মূলত জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের জন্য। বিশেষ করে অ্যাম্বুলেন্স বা সরকারি কোনো জরুরি কাজে। তবে এই নৌ রুটে ভিআইপিদের আনাগোনা বেশি থাকায় চাইলেও আমরা অ্যাম্বুলেন্স উঠাতে পারি না। সব সময়ই ভিআইপিরা এটা বুক করে রাখেন।’

ঘাটের কিছু বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। ঘাটের শৃঙ্খলা ফেরাতে ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে শিগগিরই আমরা বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের ডাকব
রহিমা খাতুন, জেলা প্রশাসক, মাদারীপুর

তবে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসি বাংলাবাজার ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এমপি, মন্ত্রী, সচিব আর যাত্রী-সবার জন্যই একই নিয়মে চলে ঘাট। ভিআইপি এলে পুলিশ তাদের প্রটোকল দিয়ে ঘাটের লাইনে নিয়ে আসে। এরপর ফেরি এলে তাঁরা ফেরিতে উঠতে পারেন।’

ভিআইপিরা ফোন করলেই বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তাঁদের জন্য আমার কিছুই করার থাকে না। তা ছাড়া আমরা ফেরির দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা। লাইন আর সিরিয়াল ঠিক করে পুলিশ, আনসার। তারা ভিআইপিদের আগে সুযোগ করে দিলে আমরাই–বা কী করতে পারি।’

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘ঘাটের কিছু বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। ঘাটের শৃঙ্খলা ফেরাতে ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে শিগগিরই আমরা বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের ডাকব। তাঁদের সঙ্গে ভিআইপি সুবিধার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন