default-image

ভারত থেকে চাল আমদানি শুরু হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সরকারি হিসাবেই বাজারে মোটা চালের কেজি এখন ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। অথচ গত বছরের এই সময়ে মোটা চাল প্রতি কেজি ৩২ থেকে ৩৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানির জন্য ৩০০ জন ব্যবসায়ীকে অনুমতি দিয়েছিল খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৬৪ হাজার টন চাল দেশে এসে পৌঁছেছে। আর সরকারিভাবে ছয় লাখ টন আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হলেও এসেছে ৪৬ হাজার টন চাল। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার কুষ্টিয়া, নওগাঁ, দিনাজপুরসহ দেশের প্রধান ধান-চালের মোকাম এবং বাজারে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম আরেক দফা বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে মোটা চাল দেশে আনতে এখনো ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। এতে দেশে প্রতি কেজি চালের দাম ৪২ থেকে ৪৩ টাকা করে পড়ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, চালের দাম এখনো না কমায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন চাল ব্যবসায়ী এবং চালকলমালিকেরা। আবার তাঁদেরই চাল আমদানির অনুমতি বেশি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা দ্রুত চাল আমদানি করলে দাম কমে যেতে পারে, এ কৌশল নিয়ে ধীরগতিতে আমদানি করছেন কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত।

এ বছরের শুরু থেকেই চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি গুদামে মজুত এবং বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় খাদ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি গুদামে চালের মজুত ছিল মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার টন। দেশের সরকারি চালের গুদামের মজুতক্ষমতা প্রায় ২৫ লাখ টন। সরকারি গুদামে ন্যূনতম ১২ থেকে ১৫ লাখ টনের মজুত থাকার নিয়ম রয়েছে। গত বছরও একই সময়ে ১৩ লাখ টনের বেশি চাল মজুত ছিল।

বিজ্ঞাপন

আমদানি দ্রুত করতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ১০ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চাল আমদানিতে ধীরগতির কারণসহ অন্য বিষয়গুলো নিয়ে সেখানে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। চাল আমদানির অনুমতি পাওয়া ১২ জন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশ আমদানি শুরু করায় ভারতেও চালের দাম বেড়ে গেছে। আর সীমান্তে জ্যামের কারণে একেকটি ট্রাক চাল নিয়ে দেশে প্রবেশ করতেই চার থেকে ছয় দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। বেশির ভাগ স্থলবন্দরে কয়লা, পাথরসহ অন্যান্য নিয়মিত আমদানি পণ্যের ট্রাক আগে থেকেই অবস্থান করছে। ফলে চালবাহী ট্রাক আসতে দেরি হচ্ছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুমও সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতে চাল আনার ক্ষেত্রে সীমান্তে ট্রাকের জ্যামসহ নানা জটিলতার কথা বলেছেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এসব জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নিয়ে সামনের দিনগুলোতে চাল দ্রুত আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর আশা, চাল আমদানি বাড়লে দাম কমে আসবে।

চালের দাম এখনো না কমায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন চাল ব্যবসায়ী এবং চালকলমালিকেরা। আবার তাঁদেরই চাল আমদানির অনুমতি বেশি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা দ্রুত চাল আমদানি করলে দাম কমে যেতে পারে, এ কৌশল নিয়ে ধীরগতিতে আমদানি করছেন কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত।
এম আসাদুজ্জামান, বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে মোটা চাল দেশে আনতে এখনো ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। এতে দেশে প্রতি কেজি চালের দাম ৪২ থেকে ৪৩ টাকা করে পড়ছে। দেশের চালকলমালিকেরাও মোকামে প্রায় একই দামে চাল বিক্রি করছেন। ফলে আমদানি করে তাঁদের খুব বেশি লাভ থাকছে না। চাল আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের আবেদন সরকারের কাছে তুলে ধরবেন তাঁরা।

বাংলাদেশ যখন আমদানির অনুমতি দেয়, তখন ভারতের বাজারে চালের দাম ছিল ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা কেজি। এর সঙ্গে প্রতি কেজিতে প্রায় আট থেকে ১০ টাকা শুল্কসহ অন্যান্য খরচ যোগ হবে।

চাল আমদানির অনুমতি পাওয়া নওগাঁর চাল ব্যবসায়ী জগদীশ চন্দ্র ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখন ১ হাজার ২০০ টন চাল এনেছেন। সেখান থেকে চাল এনে দেশে বিক্রি করলে তেমন লাভ থাকছে না।

প্রথম আলোর নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, বেসরকারি খাতে আমদানি করা চাল বাজারে আসার পরও দাম কমেনি। উল্টো দাম বেড়েছে। এক সপ্তাহে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে এক থেকে তিন টাকা বেড়েছে।

নওগাঁর খুচরা বাজারে বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি মোটা চাল (স্বর্ণা) ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা কম ছিল। আমদানি করা মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩ টাকায়। মাঝারি মানের চাল (জিরা ও কাটারি) বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৫৭ টাকায়।

গত জুন থেকে বাজারে চালের সংকট দেখা দিচ্ছিল। তখনই সরকারকে আমদানির পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দাম যখন গরিব মানুষের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন সরকার আমদানির অনুমতি দিল। আবার ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখল। শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে চাল আমদানির সব বাধা দূর করলে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এ এম এম শওকত আলী, সাবেক কৃষিসচিব

বাজারে সরু চাল হিসেবে পরিচিত জিরা (মিনিকেট নামে বিক্রি হয়) ও কাটারি চাল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায়। আমদানি করা সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকা কেজি দরে।

নওগাঁ পৌর বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি উত্তম কুমার বলেন, সব ধরনের চাল প্রতি কেজিতে এক থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আমদানি করা চাল ও স্থানীয় মিলে উৎপাদিত চালের দাম প্রায় একই সমান। তবে গ্রাহকদের কাছে স্থানীয় চালের চাহিদা বেশি।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার বিকেলে নওগাঁর পৌর বাজারে চাল কিনতে এসেছিলেন জোসনা খাতুন। তিনি অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাঁর স্বামী রিকশাচালক। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন। প্রতি মাসে প্রায় ৪৫ কেজি চাল লাগে। তিনি বলেন, সংসারের খরচ খালি বাড়ছে। কিন্তু রোজগার তো বাড়ছে না।

গত আগস্ট মাস থেকে চালের দাম বাড়তে থাকে। প্রথমে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো, দেশে যথেষ্ট পরিমাণে চাল আছে। কিন্তু কিছু ফড়িয়া এবং চালকলমালিক তা গুদামে রেখে বাজারে ছাড়ছেন না, তাই দাম বাড়ছে। খাদ্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকটি গুদামে অভিযান চালায়। তবে একপর্যায়ে অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সরকার মাঝারি ও সরু চালের দর বেঁধে দেয়।

নওগাঁর খুচরা বাজারে গতকাল প্রতি কেজি মোটা চাল (স্বর্ণা) ৪৫ থেকে ৪৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা কম ছিল। আমদানি করা মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৩ টাকায়। মাঝারি মানের চাল (জিরা ও কাটারি) বিক্রি হচ্ছে ৫৬ থেকে ৫৭ টাকায়।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বেঁধে দেওয়া দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি সরু মিনিকেট চাল ৫১ টাকা ৫০ পয়সা এবং প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ২ হাজার ৫৭৫ টাকায় বিক্রি করতে হবে। মাঝারি মানের চাল প্রতি কেজি ৪৫ টাকা এবং বস্তা ২ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। কিন্তু সেটিও মানেননি ব্যবসায়ীরা। সরকার থেকেও কিছুদিন বাজার তদারকির পর হাল ছেড়ে দেওয়া হয়। এখন বাজারে প্রতি কেজি মাঝারি চাল ৫২ থেকে ৫৬ এবং সরু চাল ৫৮ থেকে ৬২ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এরপর সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাতেও দাম কমল না।

সাবেক কৃষিসচিব এ এম এম শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, গত জুন থেকে বাজারে চালের সংকট দেখা দিচ্ছিল। তখনই সরকারকে আমদানির পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু দাম যখন গরিব মানুষের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন সরকার আমদানির অনুমতি দিল। আবার ২৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখল। শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে চাল আমদানির সব বাধা দূর করলে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে আজকে এ পরিস্থিতি হতো না।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও রংপুরের তারাগঞ্জ প্রতিনিধি)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন