এর মধ্যে ২২ আগস্ট রাতে বাবার কাছ থেকে ওই দুই শিশুকে নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ অবস্থায় ২৩ আগস্ট শিশুদের ফিরে পেতে আদালতে আবেদন করেন তাদের বাবা। শুনানি নিয়ে সেদিন হাইকোর্ট আদেশ দেন।

হাইকোর্ট দুই শিশুসন্তানকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে (উইমেন সাপোর্ট সেন্টারে) রাখতে আদেশ দেন। আদালত বলেন, তাদের মা সকাল ৮টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিশুদের বাবা দেখা করতে পারবেন।

হাইকোর্টের আদেশ অনুসারে উইমেন সাপোর্ট সেন্টার থেকে আজ সকাল ১০টার পর সিআইডির তত্ত্বাবধানে দুই শিশু আদালতে উপস্থিত হয়। শিশু দুটি একে অন্যের হাত ধরে ধীরপায়ে আদালতকক্ষের দিকে যায়। শিশু দুটি আসার কিছুক্ষণ পর আদালতে হাজির হন তাদের বাবা ইমরান। মা–ও আদালতে আসেন। আদালত খাস কামরায় দুই শিশুর বক্তব্যও শোনেন।

শুনানিতে শিশুদের বাবা ও মায়ের আইনজীবীদের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘আপনারা নিজ নিজ জায়গায় অনড়।’ তখন বাবার আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘না, মাই লর্ড।’

আদালত বলেন, ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার শিশুরা থাকুক, তা আপনারা কেউ চান না। উপায় না থাকায় সেদিন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আপনারা একটা সমাধান বের করবেন। দুই পক্ষ একমত হয়ে প্রস্তাব দিতে পারলেন না।’

মায়ের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘আমরা অনড় কোনো অবস্থানে নেই। আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে এর মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি নিউট্রাল প্লেসে বাচ্চারা থাকুক, এই ব্যবস্থাটুকু শুধু চাই। আর কোনো চাওয়া আপাতত নেই।’

আদালত বলেন, ‘এই নিউট্রাল প্লেসটা কোথায়?’ তখন মায়ের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘বারিধারায়। বাবা যদি এটি সঠিক মনে না করেন, তাহলে আরেকটি বাসা ঠিক করা যেতে পারে। খোলা মনে বলছি। মায়ের দাবি, শিশুদের সঙ্গে রাত কাটাতে চান। বাবাও সেখানে যাবে। মা–ও থাকবেন। পারিবারিক একটা পরিবেশ যাতে নিশ্চিত হয়, সে ব্যবস্থা চাচ্ছি। শিশুদের ট্রমা দ্রুত শেষ হোক।’

বাবার আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘বাবাও রাতে থাকতে পারেন।’ আদালত বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে সবাই থাকেন, আমাদের তো অসুবিধা নেই।’

এ সময় ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘ওনারা (মা) যে স্থানে অ্যাপার্টমেন্টের কথা বলেছেন, তাতে একটু আপত্তি আছে। আমরা দুই পক্ষ মিলে একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজতে পারি। বাবারও যদি রাতে থাকার অনুমতি থাকে। কেউ তত্ত্বাবধান করতে পারেন, যা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন।’

আদালত বলেন, ‘বাবা থাকুক, মা থাকুক, সবাই মিলে থাকুক, আমরা তা চাই। যেহেতু বাসা একটি ভাড়া করে ফেলেছে, অসুবিধা কী?’

ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘ওই বাসাতে একটু আপত্তি আছে। আরও বাসা পাওয়া যাবে।’

আদালত বলেন, ‘আজ দিনের মধ্যে কি বাসা ঠিক করতে পারবেন?’ তখন ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘হ্যাঁ, করা যাবে।’

আদালত বলেন, ‘আমরা কিন্তু আপনাদের সঙ্গে একটি বিষয়ে একমত যে পারিবারিক পরিবেশে বাচ্চারা থাকুক। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে শিশুরা কনটিনিউ থাকুক, এটি আদালতের ইচ্ছা না। আমরা চাই, বাচ্চারা পারিবারিক পরিবেশে থাকুক।’

এ সময় ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘একটু সময় দেন। আমরা যৌথভাবে একটি ফ্ল্যাট দেখি। এক পক্ষ একতরফাভাবে ভাড়া করে ফেলেছে।’

আদালত বলেন, ‘ভাড়া নেওয়া বাসাটিতে কটি কক্ষ আছে?’ তখন মায়ের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘তিন বেডরুম, ড্রয়িং, ডাইনিং ও তিনটা বারান্দা আছে।’ তখন ফাওজিয়া করিম বলেন, ‘আমাদের না দেখিয়ে বাসাটি ভাড়া করা ঠিক হয়নি।’ আদালত বলেন, ‘ফাওজিয়া করিম, এ বিষয়ে একটু লিবারেল হোন।’

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘যখন বাসা দেখা হচ্ছিল, তখন হোয়াটসঅ্যাপে বাবাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আইনজীবী হিসেবে আর কী করব?’ একপর্যায়ে সময় চেয়ে ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘মধ্যাহ্ন বিরতির পর আসতে পারি কি?’

আদালত বলেন, ‘কথা বলে মধ্যাহ্ন বিরতির পর আসেন। সবাই একটু পজিটিভলি দেখেন। দুজনের (বাবা-মা) কাছে শিশুরা থাক, ভালোভাবে থাক। কীভাবে কী করবেন, নিজেরা কথা বলে জানান। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা খাবে কোথায়, যাবে কোথায় এখন?’

ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘খাবারের ব্যবস্থা করছি।’ শিশির মনির বলেন, ‘খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

আদালত বলেন, ‘একসঙ্গে খেলে ভালো। কাছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল আছে। ঘুরে আসেন, ওখানে কথা বলে আসেন।’

ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘তিনটায় আসি।’ আদালত বলেন, ‘আসেন।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন