বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
‘বিগত ১৫ বছরে প্রথম আলোতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল মিজান। সে এতটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল যে তাকে ছাড়া আমাদের অনেক কিছুই হতো না, হতে পারত না’

সাংবাদিক হিসেবে মিজানুর রহমান খানের সাধারণ পরিচিতি কী? তিনি আইন, বিচার বিভাগ, সংসদ—এসব নিয়ে লেখালেখি করতেন। কিন্তু আমরা যারা তাঁকে কাছ থেকে জানি, তারা সবাই এটা মানি যে এসব বিষয়ে তিনি একধরনের পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন একজন আইন বিশেষজ্ঞ। সাধারণ সাংবাদিকতার অনেক ওপরে এর স্থান। মিজান ভাই সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন, আমার পাশের টেবিলে বসতেন। তাঁর উচ্চ স্বরে কথা বলা আমাদের জন্য সব সময় হয়তো সুখকর ছিল না। কিন্তু সেই সুবাদে আমি ও আমরা নিয়মিতই টের পেতাম দেশের বড় বড় আইনজীবী, এমনকি বর্তমান ও সাবেক বিচারপতিরাও তাঁর সঙ্গে আইনের কোনো ধারা, বিচার বিভাগের কোনো প্রসঙ্গ বা সংবিধানের বিভিন্ন ধারা-উপধারা নিয়ে আলোচনা করছেন, পরামর্শ নিচ্ছেন এবং দিচ্ছেন অথবা তর্ক-বিতর্ক করছেন।

আইন, বিচার বিভাগ বা সংসদ—এসব বিষয়ে মিজান ভাই যে পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছেন, এর সঙ্গে তাঁর একাডেমিক পড়াশোনার কোনো সম্পর্ক নেই। মনে বিস্ময় জাগবে, বরিশালের বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী একজন কী করে এমন একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছান! কোন মাত্রার আগ্রহ, ইচ্ছাশক্তি আর লেগে থাকার ধৈর্য থাকলে এমনটা সম্ভব! আইন বিষয়ে কোনো একাডেমিক ডিগ্রি ছাড়াই তিনি দেশের বড় বড় আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞের সঙ্গে এককাতারে আলোচনায় অংশ নেওয়া, তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়া বা সরাসরি বিরোধিতা করার মতো আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছিলেন। প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের পরামর্শে পরে তিনি অবশ্য আইনের পাঠ নেন। সংবিধান বা বিচার বিভাগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জটিল ও দীর্ঘ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তিনি এর বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করতে পারতেন। আমরা প্রথম আলোতে তা ছাপাতাম। আমরা জানি, সাংবাদিকের অ্যাক্টিভিজম মানায় না। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, এর মান–মর্যাদা সমুন্নত রাখা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার পক্ষে মিজান ভাইয়ের অবস্থান ছিল এতটাই দৃঢ়, যা অনেকটাই অ্যাক্টিভিজমের মতো।

সাংবাদিক হিসাবে মিজান ভাই শুধু এখানেই আটকে থাকতে চাননি। গবেষণাধর্মী কাজের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের তথ্য অনুসন্ধানে মার্কিন নথি খোঁজা ও সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে গেছেন তিনি। মাসখানেক যুক্তরাষ্ট্রে থেকে সেই সব নথি ঘেঁটে দেখা ও তার কপি জোগাড় করতে কতটা পরিশ্রম তাঁকে করতে হয়েছে, তা আমরা তাঁর মুখেই শুনেছি। সংগ্রহ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশসংক্রান্ত সোভিয়েত নথিপত্রও। সেসব নথি বিশ্লেষণ করে তিনি গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন লিখেছেন, বই প্রকাশ করেছেন।

প্রথম আলোতে মিজানুর রহমান খানের পদ ছিল যুগ্ম সম্পাদক, আর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি যুক্ত ছিলেন সম্পাদকীয় বিভাগে। সে হিসেবে তাঁর মূল কাজ ছিল সম্পাদকীয় ও কলাম লেখা। কিন্তু যিনি ২৪ ঘণ্টার সাংবাদিক, তাঁকে এই ছোট গণ্ডিতে আটকে রাখবে কে? নিয়মিতই প্রথম আলোর প্রথম বা শেষ পাতায় ছাপা হতো তাঁর প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ বা মন্তব্য। সম্ভবত খেলাধুলা ছাড়া এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে তিনি কিছু না কিছু লেখেননি বা লেখার চেষ্টা করেননি।

মিজান ভাই একবার দেশের বাইরে কোথায় যাচ্ছেন। ট্রানজিটে দেশের বাইরের এক বিমানবন্দরে একজনের সঙ্গে দেখা। নাম জানেন না কিন্তু বুঝতে পেরেছেন তিনি বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রী। কারণ, টিভি ও পত্রপত্রিকার কল্যাণে তাঁর মুখটি পরিচিত। তাঁর সঙ্গে কথা বলে নাম জেনেছেন ও পরে সেখানেই তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। গন্তব্যে পৌঁছে আমাদের কাছে সেই সাক্ষাৎকার পাঠিয়েও দিয়েছিলেন ছাপার জন্য। মিজান ভাইয়ের এই কাণ্ডকারখানা নিয়ে তখন আমরা বেশ হাসাহাসিও করেছিলাম। কোনো একটা বিষয় ধরিয়ে দিলেই হলো, সেটা নিয়ে সাংবাদিকতা বা লেখার জন্য যতটুকু খোঁড়াখুঁড়ি প্রয়োজন তা ছাড়িয়ে তিনি আরও গভীরে যেতে চাইতেন। ক্লান্তিহীনভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার অসামান্য এক সহজাত ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর সে কারণে সব সময়ই নতুন নতুন কিছু নিয়ে হাজির হতে পারতেন তিনি। প্রথম আলোতে বিশেষ কিছু করতে হবে, বিশেষ সংখ্যা করতে হবে, আমরা খোঁজ করতাম মিজান ভাইয়ের ঝুলিতে কিছু আছে কি না।

মিজান ভাই যখন যেখানে থাকতেন, সেই পরিস্থিতিকেই তাঁর কাজের বিষয়ে পরিণত করতে পারতেন, তেমনি যেকোনো জায়গাই ছিল তাঁর আফিস ডেস্ক। তা হতে পারে লঞ্চের কেবিন, সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণ বা বিমানবন্দর। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও সেখানে বসে দুটি লেখা লিখে পাঠিয়েছিলেন, তা ছাপাও হয়েছে।

প্রযুক্তির ব্যবহারে তিনি ছিলেন আমাদের বিভাগে সবচেয়ে এগিয়ে। কারও সাক্ষাৎকার নিলে তার ভিডিও করতেন। ভিডিও প্রতিবেদন তৈরি করতেন।একদিন দেখি মুঠোফোন মুখের সামনে রেখে অনর্গল বক্তৃতা বা বক্তব্য দেওয়ার মতো করে কথা বলেছেন। একসময় সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কী করছেন, মিজান ভাই?’ অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘আমার কলামটি লিখছি।’ কিছু বুঝতে না পেরে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললেন, ‘আমি মুখে যা বলছি, তা লেখা হয়ে যাচ্ছে এই সফটওয়্যারে।’ নতুন কিছু জানার বা নতুন কিছুকে গ্রহণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অসামান্য গুণ ছিল তাঁর। বিস্ময়কর অনুসন্ধিৎসু এক মন নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি।

মুঠোফোনে তাঁর তোলা কারওয়ান বাজারে দুই বাসের চাপাচাপিতে কলেজছাত্র রাজীব হোসেনের বিচ্ছিন্ন হাতের ছবি ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোর প্রথম পাতায়। আলোড়ন তুলেছিল সেই ছবি। তখন তিনি হেঁটে অফিসে আসছিলেন, একজন সার্বক্ষণিক আর আপাদমস্তক সাংবাদিক না হলে কেউ এমন একটি ছবি তোলা ও ছাপানোর জন্য বার্তা সম্পাদকের কাছে গিয়ে কেউ হাজির হয়?

দীর্ঘদিন করোনায় ভুগে মিজান ভাই চলে যাওয়ার পর আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমান লিখেছিলেন, ‘বিগত ১৫ বছরে প্রথম আলোতে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল মিজান। সে এতটাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল যে তাকে ছাড়া আমাদের অনেক কিছুই হতো না, হতে পারত না। আমি বলতে পারি যে ভবিষ্যতেও তার অনুপস্থিতিতে অনেক কিছুই হবে না প্রথম আলোতে। অনেক কিছুই করতে পারব না আমরা।’

মিজান ভাই আমাদের ছেড়ে গেছেন (১১ জানুয়ারি ২০২১) এক বছর হয়নি। মতি ভাইয়ের এই উপলব্ধি যে কতটা সত্যি, তা আমরা এখন প্রতিদিন টের পাচ্ছি। আমাদের অফিসে এখন এমন কে আছেন, যিনি করোনার সময়ে শিশু হাসপাতালের সামনে কোনো এক শিশু সুমার শ্বাসকষ্ট দেখে সেই শিশু ও তার পরিবারকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে বিকেল থেকে ভোররাত পর্যন্ত অনুসরণ করবেন, শিশুটিকে বাঁচানোর চেষ্টায় চিকিৎসকদের ফোন করে অনুরোধ করবেন, পুরো ঘটনার ভিডিও স্টোরি করবেন এবং লিখবেন মর্মস্পর্শী মানবিক প্রতিবেদন; ‘শিশু সুমা: রুগ্‌ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসহায় বলি’। কিছু কিছু কাজ করতে গিয়ে এখন আমরা সত্যিই ঠেকে যাই। বলি, ইশ্, মিজান ভাই যদি থাকতেন, তিনি এটি করতে পারতেন। আমরা এখন শুধু অতীতের মধ্যেই সান্ত্বনা খুঁজতে পারি; আমাদের একজন মিজানুর রহমান খান ছিলেন!

  • এ কে এম জাকারিয়া: উপসম্পাদক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন