আমার মনে আছে, আরেকটু বড় হওয়ার পর নানা বলতেন, আমি নাকি তাঁর কাছে ‘চুম্বক’-এর মতো । আমার টানে তাঁর অনেক সময় কাজে মন বসে না । শুধু আমার সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছা করে। আমার ছয় মাস বয়সে আতা চলে আসেন ইউকের লিডস শহরে। প্রায় প্রতিবছর আমার সঙ্গে সময় কাটাতে লিডস আসতেন। কোনো কোনো বছরে কয়েকবার। যদিও কাজের ব্যস্ততার কারণে অনেক সময়ই সেগুলো হতো মাত্র তিন- চার দিনের জন্য। আমরা দুজন একসঙ্গে বেড়াতে খুব পছন্দ করতাম। আমাদের লিডস শহর ছাড়া আমি তাঁর সঙ্গে ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড, আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গেছি। অনেক সময়ই সেগুলো ছিল একটু আলাদা ধরনের জায়গা। যেমন কুইন্সফেরি ক্রসিং (২০১৭ সালে বানানো ইউকের সবচেয়ে উঁচু ব্রিজ), ফলকার্ক হুইল (এক খাল থেকে আরেক খালে নৌকা পার করার একটা বিশাল চরকি), ব্রুনেল মিউজিয়াম (ব্রুনেল ছিলেন একজন বিশ্ববিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার)। এ থেকেই আমি বুঝতে পারি, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং খুবই ভালোবাসেন।

২০২০ সালের শুরুতে আমাকে পদ্মা সেতুর কাজ দেখতে নিয়ে গিয়েছিলেন। যেহেতু এই সেতুর ডিজাইনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি, আমার সব প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছিলাম। যেমন কেন ট্রেন রাস্তার ওপর দিয়ে না গিয়ে নিচ দিয়ে যাবে, কেন সব পাইল সমান নয়, কেন ৪০টা না হয়ে ৪১টা স্প্যান। আমি খুবই ভাগ্যবান যে আতার সঙ্গে এই বিখ্যাত কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টটা দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। একসময় অনেক অনেক লোক এই পদ্মা সেতু পার হবে, কিন্তু কাছ থেকে এর কনস্ট্রাকশন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে খুবই কম মানুষের বিশেষ করে আমার মতো ছোট কোনো বাচ্চার।

২০১৭ সালে আমি যখন ঢাকায় যাই, পয়লা বৈশাখে শুধু আমি আর আতা ঘুরতে বের হয়েছিলাম। আমরা সংসদ ভবনের সামনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলপনা দেখেছিলাম আর ঘোড়ার গাড়িতে চড়েছিলাম। তারপর আমরা বৈশাখী মেলায় গিয়ে একটা ঢোল আর অনেক বেলুন কিনেছিলাম। ঢোলটা আমার কাছে এখনো আছে। আমি মন খারাপ হলে মাঝেমধ্যে ওটা বাজাই।

আমাকে আতা যেসব খেলনা কিনে দিতেন, তার প্রায় সবই ছিল পাজল বা কনস্ট্রাকশন টয়। প্রায়ই আমাকে নানা রকম ধাঁধা দিতেন, বিশেষ করে অঙ্কের পাজল বা মজার কোনো কনস্ট্রাকশন বা প্রোগ্রামিংয়ের সমস্যা। তাঁর দেওয়া শেষ চ্যালেঞ্জ ছিল লেগো দিয়ে একটা ‘হুইলচেয়ার লিফট’ বানানো। যদিও আমি সেটা এক ঘণ্টার মধ্যেই বানাতে পেরেছিলাম, আমাকে অনেক মাথা খাটাতে হয়েছিল।

আমি আর আতা যখন একসঙ্গে রাতে থাকতাম, আমরা ঘুমানোর আগে একসঙ্গে সুরা পড়তাম। প্রথমে আমি কোরআন শরিফের শেষ তিনটা সুরা পড়তাম। তার আগের কয়েকটা সুরা আমার মুখস্থ ছিল না। সেগুলো পড়তেন আতা। তারপর আমি আমার জানা বাকি দুইটা সুরা পড়তাম। এরপর ছিল আমাদের গুগল মিনির সঙ্গে দুষ্টুমি করার সময়। আমরা চেষ্টা করতাম, উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করে গুগল মিনির মাথা গুলিয়ে দিতে!

যদিও আতা খুবই ব্যস্ত থাকতেন। আমি যখনই ঢাকা যেতাম, তিনি এয়ারপোর্টে আসতেন যেন প্লেন থেকে নামামাত্র আমাকে দেখতে পারেন আর প্লেনে ওঠার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমার সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। আমাদের শেষ সামনাসামনি দেখাও ঢাকা এয়ারপোর্টে, ৭ জানুয়ারি ২০২০ সালে। আমার একদমই তাঁকে ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করছিল না। আমি প্লেনে ওঠার ঠিক আগে আবার দৌড়ে সিকিউরিটি গেট পার হয়ে আতাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার এপ্রিল ২০২০–এ আবার ঢাকায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মহামারির কারণে যেতে পারিনি। আমার সঙ্গে শেষ কথা হয় ২৭ এপ্রিল, তিনি ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে, যে ঘুম তাঁর কখনো ভাঙেনি।

আমি আর আতা যখন একসঙ্গে থাকতাম না, আমরা প্রতিদিন স্কাইপে বা ভাইবারে কথা বলতাম। আতা পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, কখনো আমার সঙ্গে কথা বলতে ভুলতেন না। তিনি এখন যেখানেই থাকুন না কেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারলে আমি আর কিছুই চাইতাম না।

আশাজ ইনেশ জিয়া (১০ বছর), জামিলুর রেজা চৌধুরীর নাতি, লিডস, ইউকে

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন