প্রিয় নব্বই একর,

জানি না তুমি কেমন আছো। বহুদিন তোমায় দেখি না। তোমার পিচঢালা রাস্তায় আমার পায়ের চিহ্নগুলো অসময়ের বৃষ্টির ঝাপটায় ধুয়েমুছে নিশ্চিহ্ন। বসন্ত বিকেলে যেদিন গায়ে কালো চাদর জড়িয়ে প্যারিস রোডে বসেছিলাম, সেদিন তোমায় কথা দিয়েছিলাম, যত দিন থাকবে এ দেহে প্রাণ, শত যন্ত্রণায়ও ছেড়ে গিয়ে তোমায়, হবে না এ ভালোবাসার অবসান। আমি পারিনি আমার কথা রাখতে। তোমাকে ছেড়ে থাকার ভাবনা, আমার দুচোখের নোনা জলে মিশে, গড়িয়ে পড়ার শক্তিটুকু হারিয়ে হয়েছে নিঃশেষ। পারবে কি সারিয়ে দিতে, এ ব্যথা, তোমার ওই চার দেয়ালের হেলথকেয়ার। শুধু বেঁচে আছি এই কবছরের স্মৃতিটুকু পুড়িয়ে। কাফনের কাপড় জড়িয়ে চলি নিত্য। ভাবি, তোমার কোলে কি হবে শেষ ঠাঁই? শেষকৃত্যে দেখা কি হবে আমাদের? আমার শেষ আশ্রয়ের জমিটুকু যদি তোমার কোলে হতো, আমি নিশ্চিন্তে শুয়ে তোমায় আজীবন দেখতাম। তোমার রূপে গা ভাসিয়ে, না হয় আরেকবার চিৎকার দিয়ে বলতাম, ভালোবাসি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—পবিপ্রবি, তোমায় অনেক ভালোবাসি।

ভোরের কাকগুলোর কা কা ডাকে একদিন আমার ঘুম ভাঙত, আমি বকুল বিছানো পথে, বকুলের গন্ধ গায়ে লেপ্টে, চুপি চুপি তোমার সৌন্দর্যে নিজেকে ডুবিয়ে, ইটের রাস্তায় শিশিরভেজা দূর্বাঘাসে খুঁজতাম তোমায়।

ফুটন্ত রঙ্গনে যখন প্রজাপতিগুলো শূন্যতায় ভেসে থাকত, আমিও তখন কাষ্ঠল পুলে থেকে তোমার আয়নায় নিজেকে আরেকবার ঝালিয়ে নিতাম। পড়ন্ত বিকেলে তালতলার সৌন্দর্য আমাকে করত আলিঙ্গন। শরতের শুভ্র কাশফুলের মায়ায় ফ্রেমবন্দীর নেশায় ঘুরতাম এদিক-সেদিক। সূর্যমুখীর অপরূপ স্নিগ্ধতায় জেগে উঠত নতুন ভোর। ঝড়ের রাতে ঝাউবনের শোঁ শোঁ শব্দে আঁতকে উঠেও পথ হারাইনি। তোমার কি মনে পড়ে সে দিনগুলোর কথা।

তোমার দেয়ালের গ্রাফিতিগুলো আমার হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয়, শরীরে জাগায় শিহরণ। ভোঁতা উপলব্ধিগুলো বলে ওঠে, আমাকেও যে দাঁড়াতে হবে, বুঝে নিতে হবে নিজের অধিকার, নিতে হবে স্বাধীনতার স্বাদ, ছুড়ে ফেলে পরাধীনতার বাঁধ। তুমি জানো? বকুলতলায় যখন গিটার নিয়ে বন্ধুরা আড্ডা দিই, গানের তালে তালে সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যাই, স্মৃতির থলিটাকে ধীরে ধীরে পূর্ণ করে, তোমার বাতাসের ধুলাবালি শরীরে মেখে, তাকিয়ে থেকেছি অপলক। বিশ্বাস করো, কখনো ক্লান্ত হইনি। দুচোখের পাতা থেমে যায়নি। ঘাসের চাদরে মোড়া সবুজ মাঠে বসে নিজেকে বিলিয়ে দিতাম দিনে কিংবা রাতে। চাঁদনি রাতে তোমার আকাশ, এ শহরে সর্বাধিক মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা ঘটায়।

শীতের সকালে আবছা আলোয় কুয়াশার ধূম্রজাল চিরে তোমার বুকে যখন সূর্যি মামা উঁকি দেয়, পাতায় পাতায় শিশির বিন্দুগুলো যখন মুক্তোদানার মতো ঝলমল করে, শিশির ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দে তখন আমিও জ্ঞান হারাই। আমাকে পথ দেখায় তোমার মাটিতে জায়গা না পাওয়া স্থির উড়োজাহাজ। উড়তে না পারার ব্যর্থতায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে নিশ্চুপ। তবুও যেন চোখেমুখে নেই কোনো ক্লান্তির ছাপ। লাল-নীল কমলের পাড়ে বসে থেকে, আমি না শুধু তোমাকেই দেখি। তোমার স্পর্শে নিজেকে রাঙিয়ে তোমার জলে গা ভাসাই। তোমার ঘাটে নাও ভিড়াই। বর্ষাস্নাত বিকেল উপভোগ করি হলের বারান্দায়। অবিরাম জলধারায় সিক্ত হয়ে আমার প্রেমিক মনে জাগায় শিহরণ। সবুজের বুকে তোমার বসন্তের আগুন রাঙা পলাশ জাগ্রত করে আমার ঘুমন্ত সত্তা, মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায় সারা অঙ্গে। অচেতন দেহ হয় মাতাল।

ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে লাইব্রেরির পাশে লুকিয়ে থাকা কাঠগোলাপের মায়া ভিড় জমায় চোখের কার্নিশে, ছুটে চলি দুজন দুদিকে। বিচ্ছেদ পয়েন্ট দূরত্বটাকে বাড়িয়ে দিলেও মনের আকাশে ঠিকই রংধনু উঁকি দেয়। অদৃশ্য ভালোবাসায় বেঁধে দেয় আমাদের। প্রতিটি সন্ধ্যা পাখির কলরবে মুখরিত ছিল সারাক্ষণ। তাদের নীড়ে ফিরে আসার এই আকুলতাই বার্তা দিয়ে যায় হল নামের আমার দ্বিতীয় ঠিকানার। স্মৃতিবিজড়িত তোমার হলগুলোর প্রতিটি দেয়ালে শোনা যায়, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রতিধ্বনি। জোছনারাতে, ছাদে চাঁদের কলঙ্ক দেখার আশায়, নিজেই ছাইপাঁশ খেয়ে তার কলঙ্কগুলো মেখে নিতাম নিজ শরীরে। তবুও কেন জানি ভুলে যেতাম না তোমায়।

বর্ষায় কাপড়ে কাদার দাগ, প্রচণ্ড গরমের দুপুরে রুটিনমাফিক ক্লাসে উপস্থিতি তখন আমার বিষাদের কারণ হলেও, সেই স্মৃতিগুলোই আজ আমি হাতড়ে বেড়াই, স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত থেকে বোনা শুরু করি, ফেলে আসা দিনের গল্প। গ্যালারি খুঁজে যদি কিছু পাই, সেটুকু দিয়েই এবারের মতো নিশ্বাস নিই। আমার সম্বল তো ওইটুকুই। আমি এখনো জয় বাংলায় বসে থাকি, আড্ডা দিই, তোমার নীল বাসে করে ঘুরে বেড়াই, মনের গহিন পথে দরজায় ঝুলে থেকে সুর ধরি, বাতাস আমার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যায়, এভাবেই স্বপ্নে বিভোর থেকে জাতির বীরশ্রেষ্ঠদের সাহসে ছুটি চলি নিত্য। আমাকে মনে করিয়ে দেয়, যতকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরী-যমুনা বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

সৃজনীর পাশে বাসা বাঁধা হাসনাহেনার সুমিষ্ট গন্ধ গভীর রাতে তাড়া করে আমায়। কিছু সময়ের জন্য হলেও আমার মতো একলা পথিককে দেয় স্বর্গের হাতছানি। ঝাপসা আলোয় আমার চোখজোড়া স্বপ্ন দেখে, বয়ে যায় দুফোঁটা আনন্দাশ্রু। ফেরার আকুলতায় বিষণ্ন মনে বাড়ায় তোমাকে কাছে পাওয়ার প্রত্যাশা। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে সব শোক, উড়নচণ্ডী স্বপ্নগুলো আজ বড্ড বেশি বেসামাল।

প্রিয়,
পবিপ্রবি তুমি ভুলে গেলেও, আমি তোমাকে আজও ভুলিনি। তোমারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছি দিনরাত। যদি বেঁচে যায় এ প্রাণ, কেটে যায় অসুখ, তোমার সুখে আবারও সুখী হব, থেকো না বিমুখ।

*শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন