default-image

সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রক্রিয়া, অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্বচ্ছতা—সর্বোপরি গুণগত মান নিয়ে জনমনে একধরনের হতাশা, উদাসীনতা, অনাস্থা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই প্রেক্ষাপটের মধ্যে চলছে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পৌরসভাগুলোর নির্বাচন। গণতন্ত্রের ভিত্তিকে স্থায়ী ও শক্তিশালী করার জন্য এবং জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য, আস্থাসম্পন্ন অর্থবহ আর সার্বিকভাবে অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল এই নির্বাচনে। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগেই শাসক দলের (নোয়াখালীর) একজন গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতার কিছু মন্তব্য ও বিশ্লেষণ সারা দেশেই একধরনের হতাশা ও আস্থাহীনতার নতুন খোরাক জুগিয়েছে। ভিন্ন মতাবলম্বী, বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে এমনকি সরকার-সমর্থক প্রার্থীদের মধ্যেও ভীতি ও শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

এর মধ্যেও সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কয়েকটি পৌরসভার বিরোধীদলীয় প্রার্থীর জয়। আর তাও মোটামুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলকভাবেই হয়েছে। এই জয় কি কোনো ইঙ্গিত বহন করে? বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। এই জয়ের পেছনে কোন কোন নিয়ামক কাজ করেছে তা বোঝা এবং বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো একধরনের ছন্নছাড়া অবস্থায় আছে। সাংগঠনিক চর্চা নেই, দলীয় কার্যক্রম প্রায় স্থবির। এর মাঝে আছে শাসক দলের আচরণ। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আর দুঃখজনক এবং হতাশাজনক বিষয় হলো, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন সহিংসতা দেখা গেছে তা বলা যাবে না। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ সহিংসতা ঘটেছে শাসক দলের নিজেদের মধ্যে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু প্রাযুক্তিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, নতুন কিছুকে গ্রহণ করতে মানসিকতার অভাবের ফলে এ নিয়ে অনেক জায়গায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ভোটারদের উদ্যমে ঘাটতি দেখা গেছে। আবার অনেক জায়গায় ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগও আছে। যন্ত্র ব্যবহারেও ভোটদান নিরুপদ্রুব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

তবে পৌরসভাগুলোর দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত বেশি ভোটার উপস্থিতি এবং কিছু জায়গায় বিরোধী দলের প্রার্থীদের বিজয় কয়েকটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিরোধী দলগুলো মাঠে থাকলে ইতিবাচক ফল পেতে পারে। এভাবে বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি এবং নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা নির্বাচন কমিশনকে পালন করতে দেখা যায়নি। কিছু জায়গায় ভোট গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অন্যায্য আচরণ প্রকাশ্যে এসেছে, কিন্তু তাদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, তা দেখা যায়নি।

স্থানীয় সরকারের তথা সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থাহীনতা, নির্বাচনী আচরণবিধি, গুণমান, অর্থসম্পদের ব্যবহার, দলীয় কোন্দল, নির্বাচন কমিশনের অকার্যকর ভূমিকা এবং জন আস্থাহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে জনমনে আস্থার জায়গায়টা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য একটা অশনিসংকেত বলা যেতে পারে। আর তা ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দলকেই বিশ্লেষণ করতে হবে, বুঝতে হবে। শেষ কথা হলো, গণতন্ত্রের ক্ল্যাসিক্যাল ডিকটাম (ধ্রুপদি অনুশাসন) হচ্ছে, ‘স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের সূতিকাগৃহ’। স্থানীয় সরকারের গুণগত মানের সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক চর্চা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নির্ভর করে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন