১২ বছর বয়সী রুমার নাকে অক্সিজেনের নল। ওপর থেকে পড়ে বুকে আর কোমরে আঘাত। ময়মনসিংহের মেয়েটি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর বড় ভাইয়ের টাইফয়েড, চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা ঋণ। সেটা শোধ করার দায় নিল ছোট্ট শিশুটি। মা যে তার, তারও বয়স বড়জোর ৩০। বলেন, ‘পোলায় অসুখে পইড়া ঘরো বসা, এহন হাওলাত তো শোধ করা লাগব।’

কিশোরী বা শিশু হয়েছে তো কী হয়েছে। সব পরিবারের জন্য, সব উন্নয়নের জন্য। কিশোরগঞ্জের মেয়ে রুখসানা, ভুলতার নুরুন্নাহার, ওরা আমাদের তেজি অর্থনীতির নাবালিকা যোদ্ধা। এরা প্রত্যেকেই দমকলের ক্রেনে চড়ে নামতে গিয়ে অন্য কারও ধাক্কায় নিচে পড়ে গেছে। আহতরা এখানে শুয়ে আছে, মৃতরা ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু স্বীকার করা হয়েছে।

রূপগঞ্জের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানা থেকে মাইলখানেক দূরে ইউএস–বাংলা হাসপাতাল। সেখানকার পুরুষ ওয়ার্ডে পড়ে আছেন আশরাফুল (২৫)। পলিটেকনিকে পাস করে তাঁরা দুজন ঢুকেছিলেন এই কারখানায়। রিমা আখতার তাঁর ক্লাসমেটও ছিল। আশরাফুলের ফ্লোরে বানানো হতো লিচি, রিমার ফ্লোরে হতো লাচ্ছি। কাজের ফাঁকে একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা করতে এলে লিচি বা লাচ্ছি নিয়ে আসত। রিমাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আশরাফুল বলছিলেন, ‘মনে হয় মইরা গেছে ও।’

গতকাল দুপুরে যখন রূপগঞ্জের ওই কারখানায় যাই, বিশাল ওই ভবনটা যেন কাঁদছিল। দমকলের পানি চারদিক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল। অথচ তখনো চতুর্থ, পঞ্চম আর ষষ্ঠ তলায় দাউ দাউ কেমিক্যাল আগুন। সব তলার সবকিছুই পোড়া। যত ওপরে উঠি, মেঝের পানি তত গরম। সাড়ে চারতলার পরে আর ওঠা গেল না। পাঁচতলার সিঁড়িতেও ভয়াবহ আগুনের হলকা। এর আগেও পোড়া কারখানা দেখেছি, প্লাস্টিক আর মানুষের মাংসের পোড়া গন্ধ আমার চেনা। চেনা এই কালো বালিয়াড়ির মতো ছাদ, গোড়ালিডোবা মেঝে, প্লাস্টার খসে পড়া দেয়াল, চুরমার সিরামিক, ওলটানো মেশিন, বাঁকা লোহা আর ভাঙা কাচ। এর মধ্যে হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়া এক পাটি পোড়া স্যান্ডেল, অঙ্গার হয়ে যাওয়া জীবন। পায়ের মাপ দেখে বোঝা যায়—কিশোরীর।

বাইরে অনেক মানুষের ভিড়। তারাও অল্প বয়সী শ্রমিক। কী দেখে আসলে তারা? যেভাবে কসাইখানার জীবিত প্রাণীরা মৃত প্রাণীদের কাটাছেঁড়া দেখে, সে রকম ভয়ার্ত আর বিহ্বল চোখের নজর তাদের। পাশের একটি কারখানায় কাজ করা শারমিন বলছিল, ‘কারখানায় ঢুকি জান হাতে নিয়া। আর খালি আল্লারে ডাকি।’ অপুষ্টি আর দারিদ্র্য এই সব মেয়েকে খাটো করে দিয়েছে। ১২-১৪ বছরেই তাদের কর্মঠ শ্রমিক বানিয়েছে। আর এই লকডাউনে বদ্ধ কারখানার ভেতরে পুড়ে মরা কিংবা লাফিয়ে বাঁচার এক জীবন দিয়েছে।

কারখানার বাইরে ছড়িয়ে আছে অজস্র ঢিল আর ছেঁড়া স্যান্ডেল। স্বজনদের আহাজারি আর প্রতিবাদের চিহ্ন। তারা ভেতরে গিয়ে বাঁচাতে চেয়েছিল। তা না পারলে লাশ চেয়েছিল, সঠিক তথ্য চেয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সবার মুখে তালা। কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রায় ১৮০ জন কারখানায় কাজ করছিল। কিন্তু আহতরা বলছিল, একেকটি তলায় কোথাও ৫০, কোথাও ১৫০-২০০ জন করে কাজ করছিল। ছয়তলা বিশাল কারখানার এত মানুষ কোথায় গেল?

ফায়ার সার্ভিসের কর্মী মো. পারভেজ নামিয়েছেন সাত–আটটি লাশ। সঙ্গের নারী কর্মী তিনজনকে নামানোর পরে আর পারেননি। বলেন, ‘নারী না পুরুষ, নাকি শিশু—বুঝব কেমনে? পোড়া লাশের কিছুই বোঝা যায় না। কত লম্বা মানুষ পুড়ে এতটুকু হয়ে যায়!’ এবং কী আশ্চর্য, এত মানুষ, এত ভারী ভারী যন্ত্র, এত কংক্রিট পুড়ে গেল! কীভাবে যেন একটা মাস্ক না পুড়ে ছাইমেশানো পানিতে কালো হয়ে পড়ে থাকল মেঝেতে! আকার দেখে বোঝা যায়, ছোট মুখের মাস্ক।

কারখানার সামনে উল্টে আছে একটা অ্যাম্বুলেন্স। অনেক অনেক পুলিশ, অনেক অনেক ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। অনেক অনেক বড় কর্তা, অনেক অনেক সাংবাদিক। তাঁদের জন্য কোম্পানি গুদাম খুলে দিয়েছে। ডিউটি করতে যাতে কষ্ট না হয় সে জন্য জুস, পানি, নাশতার দেদার ব্যবস্থা। কানে ভাসছে এক স্বজনের আহাজারি, ‘অরা চিল্লায়া অক্সিজেন চাইছিল’। আহা রে অক্সিজেন! এই করোনায়! এই আগুনের বিভীষিকায়।

ঘটনাস্থল থেকে ফেরার সময় প্রশ্ন করি, ‘আজ তো ৯ তারিখ মাসের, তোমাদের বেতন দিয়েছে?’ একে একে সবাই জানাল, ‘না, অহনতরি দেয় নাই’। বিনা বেতনেই ওরা মরে গেল, একেবারে বিনা বেতনে!

আশরাফুল লাফ দিয়েছিলেন তিনতলা থেকে। তাঁর দুই নারী আর এক পুরুষ সহকর্মীও তিনতলা থেকে লাফ দেন। দুজনের মৃত্যু হয় তখনই, একজন মারা যান অ্যাম্বুলেন্সে। এ এক অদ্ভুত ধাঁধা! আশরাফুল বা নাদিয়াও মারা যেতে পারতেন। তখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে কথা বলত অন্য কেউ! আহা রে জীবন।

ফেরার পথে মগবাজারের সেই বিধ্বস্ত ভবন পড়ে। সেখানে সবকিছু সুনসান। দুদিন পরে রূপগঞ্জের হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজেও শ্মশানের নীরবতা নামবে হয়তো। অথচ এক দিন আগে যখন ভোর হচ্ছিল, তখন নাদিয়া ভাবছিল, বোনকে নিয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুম দেবে। নিরাপদ ঘুম। আহা রে জীবন!