default-image

রাজধানীর কড়াইল বস্তির রাস্তা থেকে চোখে পড়ে উজ্জালা বেগমের একখানা টিনের ঘর। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে পুরোনো কিছু জামাকাপড় আর একখানা খাট। টিনের বেড়ায় পুঁতে রাখা তারকাঁটায় ঝুলছে উজ্জালার বৃদ্ধ স্বামী কাঞ্চন মিয়ার দুখানা পুরোনো পাঞ্জাবি। আছে পুরোনো একখানা বৈদ্যুতিক পাখা। উজ্জালা রান্না করেন অন্ধকারাচ্ছন্ন খুপরির ভেতর। এমনই একখানা টিনের ঘরে থাকার জন্য মাস শেষে তাঁকে গুনতে হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। পানি আর গ্যাস বাবদ দিতে হয় আরও ১ হাজার ২০০ টাকা। মাস শেষে গুনে গুনে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বাড়িওয়ালার কাছে তুলে দিতে অনেক কষ্ট হয় উজ্জালার।

বিজ্ঞাপন

কোনো সন্তান নেই এই বৃদ্ধ দম্পতির। ষাটোর্ধ্ব কাঞ্চন মিয়া অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতিদিন নগরের বাসায় বাসায় ঘুরে পুরোনো জামাকাপড়, ভাঙা প্লাস্টিক জোগাড় করেন। এসব বিক্রি করে যে টাকা আয় হয়, সেই টাকায় চলে উজ্জালার সংসার। কিন্তু করোনায় কঠোর লকডাউনে বৃদ্ধ স্বামীর সেই কাজও বন্ধ। গেল বছরের লকডাউনেও কাঞ্চন মিয়া বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো শুরু করেন। বৃদ্ধ শরীরে হাড়ভাঙা পরিশ্রম সহ্য না হওয়ায় কাজ থেকে ফিরে রোজ রাতে বলতেন, ‘আমার শরীর চলে না।’

আবেগতাড়িত উজ্জালা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতবারের লকডাউনে তখন আমার স্বামীর কাজকর্ম একেবারই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো জায়গা থেকে সাহায্য পাইনি।তখন আমার বুড়া স্বামী রিকশা চালাইছে। ডাল–ভাতের পয়সা হইলে বাসায় চলে আসত। বাসায় এসে কুকানি। আমি আর বাঁচবু না। আমার তো দিওনের কেউ নেই।আমার একটা ছেলে নেই যে আমারে দেবে। নিজেরটা নিজেরই করে খাইতে হয়। বুড়া মানুষ। হাঁটতে পারে না। তাও আমাদের হাঁটতে হবে। করতে হবে। আয় না করলে খাওন কোথ্যাইকা আইব?’

উজ্জালার গ্রামের বাড়ি শেরপুর। তাঁরা তিন বোন। বড় বোন অনেক আগে থেকে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় থাকতেন। একবার গ্রাম থেকে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে এসে দেখা হয় কাঞ্চন মিয়ার সঙ্গে। বরিশালের কাঞ্চন মিয়া তাঁর বড় দুলাভাইয়ের বন্ধু।

এরপর তাঁদের বিয়ে। কাঞ্চন মিয়া প্রথম জীবনে রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন।

থাকতেন বাড্ডা এলাকায়। বয়সে তরুণ, তখন রিকশা চালিয়ে ভালো আয়–রোজগার করতেন। বিয়ের দুই বছরের মাথায় কোলজুড়ে আসে ফুটপুটে পুত্রসন্তান। তবে মাত্র সাত মাস বয়সে নিউমোনিয়ায় মারা যায় ছেলে। সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় উজ্জালা আর মা হতে পারেননি। সন্তানের মা ডাক না শোনার বেদনা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার নিজ ঘরে বসে উজ্জালা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথম আমার ছেলে হইছে। ছেলে হওয়ার সাত মাস পর মরে গেছে। আর আমি মা হতে পারিনি। সন্তান না থাকার বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছি রোজ। অনেক কষ্ট আমার। যার সন্তান নাই, তার জীবনের কোনো দাম নেই। লকডাউনের এই সময়ে আমার যদি আমার একটা সন্তান থাকত, এহন আমার বুড়া স্বামীর কাজ করতে হইত না। এহন সন্তান নাই দেইখখা আমার বুড়া স্বামীকে কাজকর্ম করে খাওন লাগে। এ রকম বয়সের মানুষ তো কাজকর্ম করে খায় না। বাসায় বইসা থাকে। ছেলেসন্তান যদি থাকত, তাহলে তো আমার স্বামী বাসায় থাকত। এহন নাই দেখেই তো নিজেরটা নিজের চলতে হয়।’

উজ্জালার স্বামী কাঞ্চন মিয়ার বয়স এখন ৬১ বছর। ১০ বছর আগ থেকে রিকশা চালানো বাদ দিয়ে ভাঙারি ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তবে বয়স বেড়ে যাওয়ায় আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। আবার উজ্জালাও অসুস্থ। তাঁর ডায়াবেটিস আছে। প্রতিদিন নিতে হয় ইনসুলিন। করোনায় দিশেহারা এখন এই পরিবার। আয় না থাকলে ঘরভাড়া কীভাবে দেবেন? কীভাবে সংসার চালাবেন? উজ্জালা বলেন, ‘সরকার যদি থাকার জন্য একটা ঘর দিত, তা–ও তো আমার অনেক উপকার হইত। স্বামী মরে গেলে আমি কীভাবে চলব, কোথায় থাকব, কিছুই ভাবতে পারি না।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন