default-image

১৯৯০ সালে ইউক্রেনে যান হাবিব। দেশ থেকেই স্নাতক পাস করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন থেকে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে যাওয়া, সেই চেষ্টা করেছিলেনও কয়েক বার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনেই থিতু হন। তিনি সেখানে কাপড়ের ব্যবসা করেন। রমরমা ব্যবসা ছিল তাঁর। একপর্যায়ে পরিচয় হয় ইউক্রেনের নারী ইলোনার সঙ্গে। পরে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে তাইয়েবের বয়স ১৮ বছর ৪ মাস। ছোট ছেলে মোহাম্মদ করিম।

বড় ছেলে তাইয়েব কিয়েভের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। হাবিব বলছিলেন, ‘রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের সমস্যা শুরু হওয়ার পর থেকেই এ অঞ্চলের অনেক সাধারণ মানুষের যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। আমার ছেলেও যেতে চাইছিল। আমরা ওর এসব কথায় তেমন গুরুত্ব দিইনি।’

২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে হামলা চালায় রুশ বাহিনী। সেই শব্দে হাবিবের পুরো পরিবারও অন্য সবার মতো জেগে ওঠে। ছেলেটি সকালের নাশতা খেয়েই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। হাবিব ও তাঁর স্ত্রী ইলোনা এতে তীব্র আপত্তি করেন।
হাবিব বলছিলেন, ‘আমি চাইনি ও যুদ্ধে যাক। এতটুকু ছেলে, ও যুদ্ধের কী বোঝে। কিন্তু ও ছিল নাছোড়বান্দা। ওর কথা আর যুক্তি শুনে আমরা আর ওকে আটকাতে পারলাম না।’

default-image

হাবিব জানান, যুদ্ধ শুরু হলে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সবার যুদ্ধে যাওয়া একপ্রকার বাধ্যতামূলক। এটা ইউক্রেনের আইনেই আছে। তাইয়েব তাই বাবা হাবিবকে সেই আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সেই সঙ্গে দেশের প্রতি কর্তব্যের বিষয়টিও স্মরণ করান।

তাইয়েব এখন কোথায় আছেন, এ প্রশ্নের জবাবে হাবিব বলেন, ‘সর্বশেষ জানি, ইরপিন এলাকায় আছে। এটি কিয়েভ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। ও ওখানে গিয়ে সামরিক বাহিনীর পোশাক পরে ছবিও দিয়েছে আমাদের।’

তাইয়েবের যুদ্ধে যাওয়ার খবর এখনো কিয়েভে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁদের একজন হাসিনুল হক প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘বাংলাদেশি হিসেবে গর্ব অনুভব করছি খবরটা জেনে। আমরা যারা এ দেশে আছি, তাদের সম্মানিত করেছে ছেলেটি।’

হাবিব জানান, ইউক্রেন বাহিনী তাইয়েবকে সাদরে গ্রহণ করেছে।

যুদ্ধে অংশ নেওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে যাওয়া। সন্তান সেই যুদ্ধে যাওয়ার পর মা-বাবা প্রচণ্ড মনঃকষ্টে আছেন। হাবিব ও তাঁর স্ত্রী ইলোনা প্রথম দিকে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন।

default-image

তবে সন্তানের এই মনোভাব, দেশের প্রতি কর্তব্যবোধ হাবিবকে যথেষ্ট গর্বিতও করেছে। হাবিবুর রহমান বলছিলেন, ‘মনটা আমাদের ভালো নেই। ছেলে চলে যাওয়ার পর দিনরাত চিন্তায় থাকি, ঘুম হয় না। কিন্তু এটা ভাবি, ছেলেটা বড় একটা কাজের জন্য গেছে। যে দেশে ছেলেটা জন্মাল, বড় হলো, সেই দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্য ও যুদ্ধে গেল। এটা বড় মনের পরিচয়। এই ভেবে মনে সাহস জোগাই।’

দূর ইউক্রেনে থাকলেও দেশের সঙ্গে হাবিবুরের যোগাযোগ আছে। গ্রামের বাড়িতে তাঁর মা এখনো জীবিত। আছেন ভাইবোন। তিনি ছেলের যুদ্ধে যাওয়ার কথা পরিবারের সবাইকে জানিয়েছেন।

হাবিব বললেন, ‘তাইয়েবের জন্য আমি বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে দোয়া চাই। দেশের মানুষকে এ কথা পৌঁছে দেন।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন