default-image

পাকিস্তান নৌবাহিনীর কয়েকজন বাঙালি সদস্য গোপনে একটি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেন। ১৯৬২ সালে করাচির মনরো দ্বীপে তাঁরা একটা গোপন সভায় মিলিত হন। সভায় উপস্থিত ছিলেন লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, লিডিং সি–ম্যান নূর মোহাম্মদ এবং লিডিং সি–ম্যান সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করবেন। পরবর্তী সময়ে আস্থাভাজন আরও কয়েকজনকে তাঁরা দলভুক্ত করেন। তাঁদের মধ্যে সামরিক–অসামরিক উভয় ধরনেরই সদস্য ছিলেন। দলের সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেনের হাতেই নেতৃত্বের ভার এসে পড়ে এবং তিনি হন দলটির মুখপাত্র।

স্বাধীনতাকামী এই দলটি সমর্থনের আশায় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে। এঁদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও মুজাফফর আহমদ। শেখ মুজিবের কাছ থেকে তাঁরা ইতিবাচক সাড়া পান। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁদের প্রথম যোগাযোগ হয় ১৯৬৪ সালে করাচিতে। মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেই শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। শেখ মুজিব তখন আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর প্রচার নিয়ে ব্যস্ত। তিনি মোয়াজ্জেমকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বলেন, নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ জিতলে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আর প্রয়োজন হবে না।

বিজ্ঞাপন

মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে থাকেন। তাঁরা একটি বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেন। ১৯৬৬ সালের জুনে তাঁর চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসায় দলের এক বৈঠকে মোয়াজ্জেম বলেন, তাঁদের নতুন রাষ্ট্রের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। সভায় সোনালি–সবুজ রঙের জাতীয় পতাকাও দেখানো হয়। রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে প্রস্তাব ছিল: ১. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; ২. যে কাজ করবে না, সে খাবে না; ৩. ব্যক্তিগত সম্পদ রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসা; ৪. কলকারখানার জাতীয়করণ; ৫. সকল নাগরিকের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা। এটাই ছিল তাঁদের পরিকল্পিত স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা।

অস্ত্র জোগাড়ের উদ্দেশ্যে দলের সদস্য মানিক চৌধুরীর মাধ্যমে ঢাকার ভারতীয় উপহাইকমিশনের প্রথম সচিব পি এন ওঝাকে অস্ত্রের একটি তালিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মোয়াজ্জেম। চট্টগ্রামের সায়দুর রহমানের মাধ্যমে মোয়াজ্জেম ১৯৬৬–৬৭ সালে ওঝার সঙ্গে পাঁচবার দেখা করেন। পঞ্চম বৈঠকে ওঝা জানান, অস্ত্র সরবরাহের আগে বিপ্লবীদের সঙ্গে ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের আলোচনা হওয়া দরকার। ১৯৬৭ সালের জুনে সিদ্ধান্ত হয়, বিপ্লবীদের প্রতিনিধিরা আগরতলায় যাবেন।

১৯৬৭ সালের ১২ জুলাই প্রতিনিধিদলের স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান ও আলী রেজা বিলোনিয়া হয়ে আগরতলা পৌঁছান। ভারতের পক্ষ থেকে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা শঞ্চরণ নায়ার। তিনি কর্নেল মেনন নামে চলাফেরা করতেন। বিপ্লবী দলের সদস্যরা নিম্নপদস্থ হওয়ায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেনি।

এই পরিস্থিতিতে মোয়াজ্জেম নিজেই আগরতলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বৈঠকের দিন করা হয় ১৯৬৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। ঠিক হয়, মোয়াজ্জেম প্রথমে নেপালে যাবেন এবং সেখান থেকে দিল্লিতে। তাঁর সঙ্গী হবেন জ্যেষ্ঠ সিএসপি কর্মকর্তা আহমদ ফজলুর রহমান। এটি আর বাস্তবায়িত হয়নি। কেননা, এর আগেই দুর্ঘটনা ঘটে যায়।

১৯৬৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি কর্মসূচি ছিল। একই সময় চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তার চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল। বিপ্লবীরা এ সুযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার ও সেনানিবাসে হামলা করে দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বিপ্লবী পরিষদের দলত্যাগী কোষাধ্যক্ষ করপোরাল আমির হোসেনের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে এ পরিকল্পনার তথ্য সরকারের গোয়েন্দা দপ্তরে চলে যায়। ফলে চট্টগ্রামে সরকারি অনুষ্ঠান বাতিল হয় এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকার গোপনে বিপ্লবী পরিষদের সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর। প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর অফিস ঘরে বসে আছেন। সামনে টেবিলের ওপর একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলা গঠনের একটি ষড়যন্ত্র উদ্​ঘাটন করা হয়েছে। ষড়যন্ত্রের হোতা নৌবাহিনীর একজন বাঙালি কর্মকর্তা।’

১৯৬৮ সালের ২ জানুয়ারি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র দপ্তর একটি ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার কথা প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছিল। ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়: পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে ভারত–সমর্থিত ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস, সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৬ জানুয়ারি ভারতীয় উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা পি এন ওঝাকে পাকিস্তান সরকার বহিষ্কার করে। এর পাল্টা জবাবে ভারত সরকার দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে দুজন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান’ আইনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে তাঁকে মুক্তি দিয়ে জেলগেটেই আবার গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রাতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ও পরিচালনার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কাজেই অন্যদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে শেখ মুজিবের নাম জড়ানো নিয়ে লুকোচুরি খেলা হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান এ ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রাখেন। তিনি এ ব্যাপারে মুজিবকে দেশদ্রোহী হিসেবে কলঙ্কিত করার সুযোগটি হাতছাড়া করতে চাননি। গ্রেপ্তার হওয়া অনেককে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়, যাতে তাঁরা মুজিবকে জড়িয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। নির্যাতন সইতে না পেরে অনেকেই রাজসাক্ষী হতে রাজি হন।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ নামে মামলা রুজু হয়। ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিলের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গঠন করা হয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। মামলায় ৩৫ জন অভিযুক্ত এবং ২৩২ জন সাক্ষীর তালিকা দেওয়া হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জন ক্ষমা পেয়ে রাজসাক্ষী হন। অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা ছদ্মনাম ব্যবহার করে গোপন তৎপরতা চালাতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান (পরশ), লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেন (আলো), আমির হোসেন মিয়া (উল্কা), ক্যাটারিং লে. মোয়াজ্জেম হোসেন (তুহিন), লিডিং সি–ম্যান সুলতান উদ্দিন আহমেদ (কামাল), স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান (মুরাদ), রুহুল কুদ্দুস সিএসপি (শেখর) ও লিডিং সি–ম্যান নূর মোহাম্মদ (সবুজ)।

১৯৬৮ সালের ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। গণমাধ্যমে এবং জন–আলোচনায় এটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

১৯৬৮ সালের জুলাই মাসে আইয়ুব খান চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। তাঁর হোটেলের সামনে বাঙালি ছাত্ররা বিক্ষোভ করেন। তাঁরা ‘রাইটস অব ইস্ট পাকিস্তান ডিফেন্স ফ্রন্ট’ গঠন করেন এবং যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা আইনজীবী টমাস উইলিয়াম কিউসিকে ঢাকায় অভিযুক্তদের পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ানোর ব্যবস্থা করেন।

ঢাকায় এসে টমাস উইলিয়াম শেখ মুজিবের পক্ষে মামলার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দেন। শেখ মুজিবের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি নিযুক্ত হন আবদুস সালাম খান।

মামলার বিস্তারিত বিবরণ, অভিযুক্তদের জবানবন্দি, সাক্ষীদের জেরা, কৌঁসুলিদের সঙ্গে অভিযুক্ত ও সাক্ষীদের সওয়াল–জবাব, অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের বিবরণ পত্রিকায় ছাপা হতে থাকে। ধীরে ধীরে জনমত সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং অভিযুক্তদের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। পুরো মামলাই সরকারের জন্য বুমেরাং হয়।

শেখ মুজিব মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ১৯৬৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় ভাসানী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল ও শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করেন। তাঁর ডাকে ৭, ৮ ও ১৩ ডিসেম্বর হরতাল হয়। পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ হয় বিভিন্ন জায়গায়। ধীরে ধীরে তৈরি হয় গণ–আন্দোলন।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে চারটি ছাত্রসংগঠন ও ডাকসুর সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তৈরি হয় ১১ দফা কর্মসূচি। ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় এক ছাত্রসমাবেশে ছাপানো ১১ দফা কর্মসূচি বিতরণ করা হয়। ১৮ জানুয়ারি শুরু হয় ছাত্র ধর্মঘট। ধর্মঘটের তৃতীয় দিন ২০ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিলে পুলিশের গুলিতে সিটি ল কলেজের ছাত্র আসাদুজ্জামান নিহত হলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় গণবিস্ফোরণ ঘটে। মতিউর রহমান, শেখ রোস্তম আলী, মকবুল এবং ১৫ বছরের এক অজ্ঞাতনামা কিশোর নিহত হন। ওই কিশোরের লাশ পুলিশ গুম করে ফেলে। বিক্ষুব্ধ জনতা সরকারি পত্রিকা মর্নিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। সরকার–সমর্থক পয়গাম পত্রিকার অফিসও আক্রান্ত হয়। পল্টনে মুসলিম লীগ নেতা এন এ লস্করের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে এক সাক্ষীর মালিকানাধীন নবাবপুর রোডে হোটেল আরজুতে জনতা আগুন দেয়। সন্ধ্যায় কারফিউ জারি হয়। কারফিউ থাকা অবস্থায় ২৫ জানুয়ারি ঢাকার নাখালপাড়ায় আনোয়ারা নামের এক গৃহবধূ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ওই সময় তিনি তাঁর শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন।

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে আইয়ুব খান ঢাকা সফরে আসেন। তিনি সব রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল বৈঠকের প্রস্তাব দেন। রাজপথে তখন জনতার স্লোগান, ‘মিথ্যা মামলা আগরতলা/ মানি না মানি না; জেলের তালা ভাঙব/ শেখ মুজিবকে আনব; গোলটেবিল না রাজপথ/ রাজপথ রাজপথ; এগারো দফা মানতে হবে/ নইলে গদি ছাড়তে হবে; শহীদের রক্ত/ বৃথা যেতে দেব না’। একই সঙ্গে দেখা গেল বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার। সেই সঙ্গে স্লোগান, ‘পাঞ্জাব না বাংলা/ বাংলা বাংলা; পিন্ডি না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা; তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা’। ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকার ঘোষণা দেয়, ১৭ ফেব্রুয়ারি জরুরি আইন প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক সেনাসদস্যদের গুলিতে নিহত হন এবং সার্জেন্ট ফজলুল হক আহত হন। ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সার্জেন্ট জহুরের লাশ নিয়ে মিছিল হয়। ওই দিন দ্বিতীয়বারের মতো গণ–অভ্যুত্থান ঘটে। জনতা প্রাদেশিক মন্ত্রী সুলতান আহমদ ও মং শু প্রু চৌধুরীর বাসায় হামলা চালায়। পুরানা পল্টনে মুসলিম লীগের এক নেতার মালিকানাধীন পেট্রলপাম্পে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া রেসকোর্সে হাউজি প্যান্ডেল, শাহবাগে প্রাদেশিক মন্ত্রী খাজা হাসান আসকারী এবং পরীবাগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিনের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এস এ রহমান যে অতিথি ভবনে থাকতেন, সেটিও অগ্নিদগ্ধ হয়। তিনি কোনোক্রমে পালিয়ে রক্ষা পান।

শেখ মুজিব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি গোলটেবিল বৈঠকে যাবেন। তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ আওয়ামী লীগের একটি অগ্রবর্তী দল ইতিমধ্যে রাওয়ালপিন্ডি চলে গেছে। তাঁরা বৈঠকে শেখ মুজিবের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য তাঁর জামিনের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু এ মামলায় জামিনের সুযোগ ছিল না। তখন উপায় বের হলো যে শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্ত হয়ে বৈঠকে যোগ দেবেন। মুজিব আমীর–উল ইসলামকে প্যারোলের আবেদন জানাতে বলেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে প্যারোলের ব্যাপারে শুনানি হওয়ার কথা ছিল। প্যারোলে যাওয়ার বিষয়টি জনমনে একটি আপস হিসেবে বিবেচিত হয়। ওই সময় যুবনেতা সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক শেখ মুজিবের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে বোঝান যে শেখ মুজিব যেন প্যারোলে যেতে রাজি না হন। বেগম মুজিব সেনানিবাসে গিয়ে শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্ত হয়ে বৈঠকে যেতে নিষেধ করেন। শেখ মুজিব ঘোষণা দেন, তিনি প্যারোলে যাবেন না।

মুজিববিহীন গোলটেবিল বৈঠক ফলদায়ক হবে না বিধায় আইয়ুব খান বিপাকে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা দেন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি দাঁড়াবেন না। ২২ ফেব্রুয়ারি এক ঘোষণায় আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সব অভিযুক্ত মুক্তি পান। ঢাকায় অবস্থিত সেনাবাহিনীর চতুর্দশ ডিভিশনের জিওসি মে. জে. মোজাফফর উদ্দিনের নির্দেশে গভর্নরের অসামরিক বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার রাও ফরমান আলী সেনানিবাসের বন্দিশালা থেকে শেখ মুজিবকে নিজে গাড়ি চালিয়ে ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছে দেন। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এই সভায় জনতার পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত করা হয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি এ দেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতা হিসেবে উত্তরণ ঘটে। দ্বিতীয়ত, ১১ দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ছাত্রনেতৃত্বের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তৃতীয়ত, শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালির আশা–আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিক্রিয়ায় যে জনমনস্তত্ত্ব তৈরি হয়, সেখানে পাকিস্তানবাদের কফিনে পেরেক ঠুকে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভ্রূণটি জন্ম নেয়, ১৯৬২ সালে করাচির মনরো দ্বীপের এক বৈঠকে নৌবাহিনীর কতিপয় বাঙালি সদস্য যার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক–গবেষক

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন