বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গ্রাফিন বিপ্লবের শুরুটা ২০০৪ সালের অক্টোবরে। তখন পদার্থবিজ্ঞানীরা গ্রাফিন তৈরি করেন; যা দ্বিমাত্রিক কার্বন পরমাণু পাত (শিট)। এরপর ২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ করেছে গ্রাফিন ট্রানজিস্টরের বিশাল পরিবর্তন। নেচারের প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রাফিনের যুগান্তকারী পরীক্ষার জন্য আন্দ্রের গাইম ও কনসটানটিন নভোসাভ যৌথভাবে পদার্থে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, ২০১০ সালে।

কার্বন থেকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদার্থ তৈরি হয়েছে। প্রথমেই এসেছিল অত্যাধুনিক কার্বন ন্যানোটিউব (সিএনটি)। কিন্তু বাজারে সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে ইলেকট্রনিকস দুনিয়ায় গ্রাফিন ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলেছে।

বর্তমানে কম্পিউটারে ও মোবাইল ফোনে গ্রাফিনের তৈরি ফ্ল্যাক্সিবল ডিসপ্লে ব্যবহৃত হচ্ছে। কার্ভড বা বাঁকানো ডিসপ্লেতে ব্যবহার হচ্ছে এটির। এতে স্ক্রিনের সাড়াদানের গতি বেড়ে গেছে।

তবে ব্যাপকভাবে গ্রাফিন ব্যবহৃত হচ্ছে না এখনো। বিশ্ববাজারেও এটির উপস্থিতি খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। ট্রানজিস্টরে গ্রাফিনের ব্যবহার দ্রুতই হতে যাচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।

গ্রাফিন কেমন
গ্রাফিন পাশাপাশি সাজানো পরমাণুর আন্তসংযোগের একটি বিন্যাস। এখানে প্রতিটি পরমাণু একেকটি কার্বন। পরমাণুগুলো মৌচাকের নকশার মতো একটার সঙ্গে আরেকটা সংযুক্ত থাকে। অর্থাৎ একটি জালের ষড়ভূজের মতো; যেখানে প্রতিটি কোনায় একেকটি কার্বন থাকে।

গ্রাফিন দ্বিমাত্রিক। অর্থাৎ পরমাণুগুলো পাশাপাশি অবস্থায় থাকে; একটার ওপর আরেকটা না। খুবই ক্ষুদ্র হওয়ায় হাই রেজল্যুশন ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কপ ছাড়া দেখা যায় না।

গ্রাফিনের সংজ্ঞা অনুসারে, এতে ছয়টি কার্বন থাকতেই হবে। মাঝেমধ্যে ইলেকট্রনের গতি আরও বাড়াতে কোনো একটি কার্বনের বদলে এতে বোরন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এতে গ্রাফিন পুরোপুরি বিশুদ্ধ থাকে না।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনটেল করপোরেশনের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশি শায়েস্তাগীর চৌধুরী। গ্রাফিনে ছয়টি কার্বনের বিষয়ে এ বিজ্ঞানী প্রথম আলোকে বলেন, একটা কার্বন পরমাণুর বাইরের আবরণে চারটি ইলেকট্রন থাকে। ইলেকট্রনগুলোর মাধ্যমে একটি কার্বন অন্য কার্বনের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে, একে বলে সমযোজী বন্ধন (কোভ্যালেন্ট বন্ড)। পরে কার্বনগুলো ষড়ভুজের আকৃতি তৈরি করে। এটা প্রাকৃতিক নিয়মে হয়।

‘গ্রাফিনে অগ্রসর: পরবর্তী প্রজন্মের দ্বিমাত্রিক উপাদান প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার। প্রতিবেদন অনুসারে, পাশাপাশি থাকা প্রতিটি পরমাণু পাশের তিনটি কার্বন পরমাণুতে ইলেকট্রন আদান–প্রদান করে। মৌচাকের মতো গঠনের কারণে নতুন কোনো ইলেকট্রন সংযুক্ত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কপারের মতো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে একটি ইলেকট্রন চলাচল করতে পারে মিনিটে ১ দশমিক ২ ইঞ্চি দূরত্বে। কিন্তু ইলেকট্রন মিনিটে ২ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ইঞ্চি দূরত্বে যেতে পারে বলে গ্রাফিনের শুরুর দিকের পরীক্ষায় দেখা গেছে। ইলেকট্রনের এই গতিতে ইলেকট্রনিকস যন্ত্র মাত্র কয়েক মিনিটে, এমনকি সেকেন্ডেও চার্জ করা যায়।

গ্রাফিনের একটি পাত মাত্র দশমিক ৩৪ ন্যানোমিটার চ্যাপ্টা। তবে ইস্পাতের চেয়ে শক্ত, বুলেটও থামিয়ে দিতে পারে। মজার বিষয়, এটি প্রসারিতও হয়। অর্থাৎ গ্রাফিন একই সঙ্গে কঠিন ও নমনীয়।

কেন দ্বিমাত্রিক গ্রাফিনে ঝোঁক
ইনটেলের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে দ্বিমাত্রিক গ্রাফিন তৈরির কাজ করছেন। তাঁদের ট্রানজিস্টরে আগে স্বর্ণ, টাংস্টেন, কপার, টাইটেনিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট, হফনিয়াম, সিলিকন ইত্যাদি ত্রিমাত্রিক ধাতু ব্যবহার করা হতো।
ত্রিমাত্রিক ধাতুর তিনটি দিক: এক্স, ওয়াই ও জেড। ইলেকট্রনগুলো এই তিনটি দিকে ছুটোছুটি করে। কিন্তু গ্রাফিনে ইলেকট্রনগুলো শুধু এক্স ও ওয়াই; অর্থাৎ ডানে–বাঁয়ে ও সামনে–পেছনে ছুটোছুটি করে।

বিজ্ঞানী শায়েস্তাগীর চৌধুরী বলেন, ত্রিমাত্রিক পদার্থের ইলেকট্রন সবদিকে চলাচল করায় এর গতি কমে যায়। সমস্যা সমাধানে কার্বন দিয়ে গ্রাফিন তৈরির বিষয়টি আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা।

মাইক্রোপ্রসেসর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাফিনে ঝোঁকার অন্যতম আরেকটি কারণ, এতে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা বাড়ানো। বর্তমান মাইক্রোপ্রসেসরে কয়েক বিলিয়ন ট্রানজিস্টর থাকে। মাইক্রোপ্রসেসর আরও শক্তিশালী করতে যোগ করতে হবে আরও ট্রানজিস্টর। এটি সম্ভব ট্রানজিস্টরের আকার আরও ছোট হলে; যা গ্রাফিন ব্যবহারে সম্ভব।

ইনটেলের বর্তমান প্রসেসরগুলোর দৈর্ঘ্য এক ইঞ্চির এক–চতুর্থাংশের মতো। প্রতি দুই বছরে এই প্রসেসরের আয়তন শতকরা ২০ ভাগ করে কমানো হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানী শায়েস্তাগীর চৌধুরী। এ ক্ষেত্রে দ্রুত কর্মক্ষম দ্বিমাত্রিক উপাদান হিসেবে গ্রাফিনের মতো পদার্থের বিকল্প নেই।

গ্রাফিনের মূল চারটি গুণ
কেন গ্রাফিন রাজত্ব করবে, তা ব্যাখ্যা করেছে অলঅ্যাবাউটসার্কিটস ডট কম।
উচ্চ বৈদ্যুতিক গুণ: তাত্ত্বিকভাবে গ্রাফিন বৈদ্যুতিক প্রবাহ স্থানান্তর করতে পারে শতভাগ কার্যকরভাবে। সাধারণত রুম টেম্পারেচারে (ভবনের ভেতরের স্বস্তিদায়ক তাপমাত্রা) গ্রাফিনের ভেতরের গতিশীলতা খুবই বেশি; সিলিকনের চেয়ে ১০০ গুণ।
অন্যদিকে কপার ও স্বর্ণের মতো ধাতুর ইলেকট্রনের গতি ১০ থেকে ৩০ ভাগ ক্ষয় হয় বলে জানান ইনটেলের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বলেন, অন্য ধাতুতে তাপ দিলে ইলেকট্রনের গতি বাড়ে। কিন্তু গ্রাফিনে আলাদা কোনো তাপ না দিয়ে রুম টেম্পারেচারেই গতি অনেক। আর ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলো উত্তপ্ত না করে ইলেকট্রনের গতি বাড়াতে হয়।

উচ্চ তাপ পরিবাহিতা: গ্রাফিন একটি আইসোট্রপিক পরিবাহী; অর্থাৎ এর তাপ পরিবাহিতা সবদিকে সমান। আর এর তাপ পরিবাহিতা অন্য পদার্থের চেয়ে ভালো—বিশেষ করে হীরা, কার্বন ন্যানোটিউব ও গ্রাফাইটের চেয়ে।

ভালো আলোকসুবিধা: গ্রাফিন খুবই পাতলা। এটি দৃশ্যমান ও সাদা আলোর (রংবিহীন আলো। যেমন: দিনের বেলার প্রাকৃতিক আলো) শতকরা প্রায় ২ দশমিক ৩ ভাগ শোষণ করতে পারে। গ্রাফিনের এ গুণের সঙ্গে শ্রেষ্ঠতর বৈদ্যুতিক গুণাবলির মিশ্রণে অধিক সক্ষমতার সোলার সেল তৈরি করা সম্ভব। ফলে ইলেকট্রনিক ফোন বা কম্পিউটারের দুর্দান্ত গতিশীল স্ক্রিন তৈরি সম্ভব হচ্ছে।

চমৎকার রাসায়নিক গুণ: গ্রাফিন একটি জড় পদার্থ। এটি অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে দ্রুত রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে গ্রাফিন বিভিন্ন ধরনের অনু ও পরমাণু শোষণ করতে পারে। শায়েস্তাগীর চৌধুরী বলেন, ‘ধাতুকে সালফিউরিক বা হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডে ছেড়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া হয়ে ধাতুটা গলে যায়। কিন্তু কার্বনকে গলানো যায় না। এ জন্য এটি কেমিক্যালি খুব শক্ত।’

ট্রানজিস্টরে শাসন করবে গ্রাফিন!
কম্পিউটারের মস্তিষ্ক হিসেবে পরিচিত মাইক্রোপ্রসেসর; যাতে মূলত ট্রানজিস্টর থাকে। কয়েক বিলিয়ন ট্রানজিস্টর একটার ওপর আরেকটা বসিয়ে তৈরি হয় এক ইঞ্চি আকারের একটি মাইক্রোপ্রসেসর।

ট্রানজিস্টরের তিনটি অংশ—সোর্স, গেট ও ড্রেইন। সোর্স থেকে ইলেকট্রন উৎপন্ন হয়ে গেটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ড্রেনে যায়। ট্রানজিস্টর সুইচের মতো; অন করলে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়। একটি ট্রানজিস্টরের সঙ্গে আরেকটার সংযোগ থাকে।
মাইক্রোপ্রসেসরে কয়েক বিলিয়ন ট্রানজিস্টর থাকে, যাতে দীর্ঘ সময় ইলেকট্রন ধরে রাখা যায়। এভাবে কম্পিউটারের কার্যক্রমের সময় বাড়ানো হয়। তাই ট্রানজিস্টরের গতি বাড়ানো ও আয়তন কমানোর কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। এ ক্ষেত্রে গ্রাফিনের বিকল্প অন্য কিছু দেখছেন না তাঁরা।

তবে এখনো ট্রানজিস্টরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না গ্রাফিন। যদিও তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (টিএসএমসি) ইতিমধ্যে গ্রাফিন দিয়ে তৈরি ট্রানজিস্টর প্রদর্শন করেছে। ২০২০ সালে প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক টেক সিম্পোজিয়ামে টিএসএমসি গ্রাফিনের দুর্দান্ত কার্যক্ষমতা দেখায়।

গ্রাফিন তৈরির মূল সমস্যা দুটি বলে জানান শায়েস্তাগীর চৌধুরী। এগুলো হলো পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব ও ৫০০ থেকে ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার আবশ্যকতা।
এই বিজ্ঞানী বলেন, গ্রাফিন তৈরিতে কার্বনের নতুন উৎসের গবেষণা চালাচ্ছেন তাঁরা। পাশাপাশি কার্বনের সঙ্গে বোরনের মতো উপাদান যোগ করে গ্রাফিনে ইলেকট্রনের গতি আরও বাড়ানোরও চেষ্টা চলছে।

তবে মাইক্রোপ্রসেসর উৎপাদনকারীদের মধ্যে গ্রাফিন ব্যবহারের শুরুটা করবে ইনটেল—জানান শায়েস্তাগীর চৌধুরী। তিনি বলেন, ইনটেল গ্রাফিন ব্যবহারের কথা অনেক আগেই শুরু করেছে এবং এ পথে যেতেই হবে। এ ছাড়া আইবিএমও দ্রুত শুরু করতে যাচ্ছে।

ইনটেলের এই প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞানীরা ১০ বছর পরের কথা চিন্তা করি। আজকে যা দেখছে, তা ১০ বছর আগের চিন্তার ফসল। ইনটেল, আইবিএম ও অন্যান্য প্রতিযোগীরা গবেষণা নিয়েও প্রতিযোগিতা করি। চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাফিন ব্যবহার করতে যাচ্ছে নিশ্চিতভাবেই।’

বাংলাদেশও সম্ভব গ্রাফিন তৈরি
কম খরচে গ্রাফিন তৈরির উপাদান প্রাকৃতিক গ্যাস; সঙ্গে দরকার একটি ভ্যাকুয়াম চেম্বার ও উচ্চ তাপমাত্রা, জানান শায়েস্তাগীর চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ হলে গ্রাফিন তৈরি করা সহজ। দেশের মিথেন গ্যাস অনেক বিশুদ্ধ। এ গ্যাস সক্রিয় হাইড্রোকার্বন চেইনে রূপান্তরিত করে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গ্রাফিন তৈরি করা যায়।

এই বিজ্ঞানী বলেন, দেশের মিথেনে (CH4) কেন্দ্রে একটা কার্বন, বাইরে চারটি হাইড্রোজেন থাকে। মিথেনকে ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপে উত্তপ্ত করা হয় ভ্যাকুয়াম পাত্রে। তখন হাইড্রোজেন ও কার্বনের প্রতিক্রিয়ায় কার্বন ভেঙে যায়, হাইড্রোজেন মুক্ত করে দেয়। কার্বন রাখাটাই মুখ্য এখানে। একইভাবে মিথেনের আরেকটা রূপ অ্যাসিটিলিন (C2H2) থেকেও কার্বন আলাদা করা যায়।

ইনটেলের এ বিজ্ঞানী বলেন, পাশের দেশ ভারতে ইতিমধ্যে গ্রাফিন নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে গ্রাফিন তৈরির কাজ করছে দেশটি। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস থাকতেও গ্রাফিন তৈরির প্রক্রিয়া এগোয়নি।

বাংলাদেশ এ–সংক্রান্ত গবেষণায় না এগোলেও বসে নেই অন্যরা। বিশেষ করে বিশ্বের সব শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রানজিস্টরে গ্রাফিন বা গ্রাফিনের মতো উপাদান ব্যবহার করতে যাচ্ছে দ্রুত—বলছে নেচার।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন