তাঁদেরই একজন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নেপালতলী ইউনিয়নের চকডঙর গ্রামের নাইচ আকতার। বিয়ের পর স্বামী সাজেদুরকে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেন স্নাতক পাস এই নারী। মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে পেঁপে চাষের মাধ্যমে তাঁর শুরু। সঙ্গে বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গাভি পালন, সেলাই ও হাতের কাজও চালিয়ে গেছেন।

নাইচ আকতার জানান, শুরুতে খেতের ফসল বিক্রির জন্য স্বামীকে হাটে পাঠাতেন। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের ঠিকঠাক দাম পেতেন না। বাজারদর আগে থেকে না জানার কারণে প্রায়ই ঠকতেন।

নাইচ আকতারের মতে, বাস্তবতা বদলেছে। এখন আর খেতে উৎপাদিত সবজি বিক্রির জন্য স্বামীকে হাটে পাঠান না। স্মার্টফোনের মাধ্যমে নিজেই পাইকারি ক্রেতাদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ করেন। এর মধ্যেই রপ্ত করে নিয়েছেন স্মার্টফোন, ই–কমার্সের ধারণা।

নাইচ আকতার আরও বলেন, তাঁর গ্রামের অন্যান্য নারী কৃষকের কাছ থেকে অনলাইন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম পারমিদা, মার্কেট বাংলা, আবাদ, দারাজ বাংলাদেশ, ফুড ফর নেশনের মতো নানা প্রতিষ্ঠান সরাসরি কৃষিপণ্য সংগ্রহ করছে।

উপজেলার নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনাকালে অনলাইনে পণ্য বিক্রির যে অভ্যাস ও আস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে অন্যদেরও স্মার্টফোন, ই-কমার্সে আগ্রহ বাড়ছে। গ্রামের কৃষক ও নারীদের মধ্যে দিনদিন বাড়ছে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা।

সরবরাহ সুবিধা বাড়ানো হলে অনলাইনে বেচাবিক্রি আরও বাড়বে বলে তাঁদের বিশ্বাস।
এ প্রসঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মার্কেট বাংলা ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান জুয়েল বলেন, এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করে বিদ্যমান অনলাইন মার্কেট প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা সম্প্রসারিত করতে হবে।

২০১৬ সালে নেদারল্যান্ডস সরকারের অর্থায়নে একশনএইড বাংলাদেশ সহযোগী সংস্থা আসিয়াবের মাধ্যমে এমএমডব্লিউডব্লিউ নামের একটি প্রকল্প বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় চালু করে। এই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ১ হাজার ২২১ জন নারীকে উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে নারী কৃষকদের স্মার্টফোন, ই-কমার্স সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

একই উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়নের গড়েরবাড়ি গ্রামের বেবী বেগম, মধ্যকাতুলী গ্রামের মাহমুদা বেগমও একশনএইড বাংলাদেশের এমএমডব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

নারী উদ্যোক্তা বেবী বেগম মুরগি পালনের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজও করেন। বর্তমানে তাঁর খামারে ১ হাজার ৫০০ সোনালি জাতের মুরগি আছে।

বেবী বেগম বলেন, করোনার সময় খামারে মুরগি বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইন্টারনেটে যোগাযোগ করেন অনলাইনভিত্তিক একটি ই-কমার্স কোম্পানির সঙ্গে।

default-image

সেই থেকে নিয়মিত অনলাইনে দেশি মুরগি, দেশি ডিম, হাঁস, আচার,শাকসবজি, হাতের কাজ করা পোশাক-পরিচ্ছদ, নকশিকাঁথাসহ নানা জিনিস বিক্রি করছেন।

আরেক নারী উদ্যোক্তা মাহমুদা বেগম সফল সবজিচাষি হিসেবে এলাকায় বেশ পরিচিত। চাষের পাশাপাশি খেতের সবজি অনলাইনে বিক্রির কৌশলও শিখেছেন তিনি। ছেলের কাছ থেকে অনলাইন মার্কেটিংয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে সহযোগিতা নেন মাহমুদা। তাঁর অনলাইন ক্রেতার তালিকায় রয়েছে পারমিতা, আগোরা, আউড়ি, আবাদ, দারাজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। অনলাইনে বিক্রির ক্ষেত্রে পাশের সুখানপুকুর মহিলা মার্কেট সেডে সবজি পাঠান তিনি। সবজি ছাড়াও অনলাইনে নকশিকাঁথা সরবরাহ করছেন মাহমুদা।

মাহমুদা বেগম বলেন, ২০১৬ সালে একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় ২৫ জন নারী নিয়ে তিনি গ্রামে একটি সমিতি করেছেন। এরপর সমিতির সদস্যরা চাষাবাদের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে। আগে খেতের সবজি বিক্রির জন্য মহাস্থানগড় হাটে নিতেন। দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে এমএমডব্লিওডব্লিও প্রকল্প থেকে অনলাইনে স্মার্টফোন, ই–কমার্স মার্কেটের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

নাইচ আকতার বলেন, তাঁরা খেতে ফসল চাষাবাদের পাশাপাশি নিজেরাই বাজারজাতকরণের কাজ করছেন। ই–কমার্স ব্যবসায় সমস্যার কথা জানিয়ে নাইচ আকতার বলেন, উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় ই–কমার্স কোম্পানিগুলোর ক্রয় চাহিদা খুবই কম। এতে করে সিংহভাগ উৎপাদিত পণ্যই স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে।

বাজার বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রামের অন্য নারীদেরও কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং অনলাইন বাজার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে নারীরা শুধু সচ্ছল-স্বাবলম্বী হবেন না, ই–কমার্স কৃষিতে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, চাঙা হবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।

এ প্রসঙ্গে এমএমডিব্লিউডব্লিউ প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী শওকত আকবর ফকির বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির এই অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য চাই সরকারের পক্ষ থেকে বৃহত্তর উদ্যোগ। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করার জন্যও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন