বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নেহাল করিম প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ঈদে গ্রামের বাড়িতে যায় উৎসবের সময়টুকু স্বজনদের সঙ্গে কাটাতে। যাঁদের গ্রামের সঙ্গে যোগসূত্র আছে, তাঁরাই গ্রামে যান। আর এই যোগসূত্র থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি। তিনি বলেন, ‘আমরা শহরে এসেছি বেশি দিন হয়নি, ৪০-৫০ বছর আগে। এখনো আমরা স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে গ্রামকে ব্যবহার করি।’

অধ্যাপক নেহাল করিমের মতে, নতুন প্রজন্ম শহরকে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে বেশির ভাগ মানুষের শিকড় গ্রামে।

default-image

কত মানুষ ঢাকা ছাড়বে

করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৮ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকা ছেড়েছিলেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ঈদকে কেন্দ্র করে এবার ঢাকা ছাড়তে পারেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। ঈদের আগের চার দিন প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ মানুষ ঢাকা থেকে গ্রামে যেতে পারেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাবে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এ জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দুই ঈদে গ্রামে যান। এবার করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ঈদযাত্রায় ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মোট মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণ করে। এনটিএমসির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঈদযাত্রায় ৬৫ লাখ মানুষ ঢাকা ছেড়েছিলেন। এই সংখ্যা ‘ইউনিক ইউজার’ ধরে। এর মানে হলো, এক ব্যক্তির একাধিক সিম থাকলেও তাঁকে একজন গ্রাহক হিসেবেই গণ্য করা হয়েছে। মুঠোফোনের সিম ব্যবহার ধরে তৈরি করা এনটিএমসির এই হিসাবের আওতায় মুঠোফোন ব্যবহার করেন না, এমন মানুষ ও শিশুরা আসেনি। তবে এই হিসাব থেকে ঢাকা ত্যাগ করা মানুষের সংখ্যা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) হিসাবে, রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এ জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দুই ঈদে গ্রামে যান। এবার করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মহামারির পর এবারই বাড়ির পথে

দেশে ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথম করোনা শনাক্তের কথা জানায় সরকার। এরপর ২০২০ ও ২০২১ সালের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মোট চারটি ঈদ কেটেছে করোনার বিধিনিষেধের মধ্যে। করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঈদযাত্রায় ছিল কড়াকড়ি। তারপরও অনেকে বাড়ি ফিরেছিলেন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় তা ছিল কম। এবার করোনার সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এবং বিধিনিষেধ না থাকায় বহু মানুষ ছুটবেন গ্রামে।

গত দুই বছর ঈদে বাড়ি যাননি একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইলিয়াস আহমেদ। এবার বাড়ি যাবেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার ভাইবোন প্রত্যেকের আলাদা সংসার আছে। করোনার পর এবারই প্রথম সব ভাইবোন ও তাঁদের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ঈদ করব। কয়েকটা দিন গ্রামের বাড়ি পুরো সরগরম থাকে।’

default-image

এবার ঈদের সরকারি ছুটি ১, ২ ও ৩ মে। ঈদ ৩ মে হলে ৪ তারিখও ঈদের ছুটি। আর ঈদের ছুটির আগে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বাস্তবে ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে দুই দিন আগে। তারপর শুধু বৃহস্পতিবার (৫ মে) অফিস খোলা। পরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে বৃহস্পতিবার অনেকেই ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন। তাই সব মিলিয়ে হিসাব করলে এবার ঈদে ছুটি ৯ দিন।

এই লম্বা ছুটি কাজে লাগাতেও বাড়ির পথে ছুটছেন অনেকে। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আতিক মোহাম্মদ শরীফের বাড়ি বগুড়া সদরে। বাড়িতে মা-বোন থাকেন। করোনার কারণে গত চারটি ঈদে বাড়ি যেতে পারেননি।

আতিক মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শনিবার বাসের টিকিট কেটেছি। এখনই মনের মধ্যে একটা আনন্দের অনুভূতি আসছে। ঈদের সময় এলাকার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সবার সঙ্গে দেখা হয়। বাড়িতে ঈদ করার ক্ষেত্রে অন্য রকম একটা আবেগ কাজ করে।’

বাড়ি ফেরার স্রোতে শ্রমজীবীরাও

ঈদে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া জনস্রোতের বড় অংশ শহরের শ্রমজীবী মানুষ। ঈদের আগে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিয়জনদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনে বাড়ি ফেরেন তাঁরা। রাজধানীর কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে থাকেন জুলেখা বেগম। বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। ঈদের আগের দিন জুলেখা ফিরবেন গ্রামের বাড়ি জামালপুরে।

জুলেখা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে বাসায় কাজ করি, সবাই কম-বেশি ঈদ বোনাস (উৎসব ভাতা) দিয়েছে। একটা বাসা থেকে শাড়ি কাপড় দিয়েছে। বাড়িতে মা, বোনেরা থাকে। সবার জন্য টুকটাক কিছু কিনেছি। আগের বছর বাড়ি যাইনি। এবার এলাকার আরও অনেকেই একসঙ্গে যাচ্ছি।’

এবার ঈদের সরকারি ছুটি ১, ২ ও ৩ মে। ঈদ ৩ মে হলে ৪ তারিখও ঈদের ছুটি। আর ঈদের ছুটির আগে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বাস্তবে ছুটি শুরু হয়ে যাচ্ছে দুই দিন আগে। তারপর শুধু বৃহস্পতিবার (৫ মে) অফিস খোলা। পরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ফলে বৃহস্পতিবার অনেকেই ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন। তাই সব মিলিয়ে হিসাব করলে এবার ঈদে ছুটি ৯ দিন।

ঢাকা, সাভার ও গাজীপুর এলাকায় গড়ে ওঠা তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকদের সিংহভাগই গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন। ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের তালিকায় পোশাককর্মীদের সংখ্যা বেশি। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে কিংবা ট্রেনের ছাদে ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাড়িতে পৌঁছাতে হয় এই মানুষগুলোর। কারণ, অনেক পোশাকশ্রমিক দম্পতির সন্তানেরা গ্রামে থাকে। ঈদে বাড়ি ফিরলে বাবা দেখতে পারেন সন্তানের মুখ। মা শুনতে পারেন ‘মা’ ডাক। শ্রমিকেরা বছরে দুই ঈদ ছাড়া বড় ছুটি পান না। তাই ঈদে বাড়ি ফিরতে বেপরোয়া থাকেন তাঁরা।

‘সারা বছর যানবাহনের ভেঁপুর শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কয়েকটি দিনই তো শুধু পাখির ডাক শুনি।’
আরিফুর রহমান, ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা

মেলবন্ধনের সুযোগ

শহরে থাকা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে গ্রামে থাকা প্রবীণদের মেলবন্ধনের সুযোগও করে দেয় ঈদের বাড়ি ফেরা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শুভজিৎ রহমান এবারের ঈদের ছুটিতে যশোরের মনিরামপুরে দাদার বাড়ি যাচ্ছে। সে বলল, ‘দাদাবাড়িতে যেতে ভালো লাগে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকলেও দাদাবাড়ি যাওয়া হয়নি। এবার উত্তেজনা কাজ করছে।’

ঈদ উপলক্ষে মানুষের ঢাকা ছাড়া বিগত তিন-চার দিন ধরে চলছে। ঢাকার রাস্তায় যানজটও কিছুটা কম। অবশ্য সবচেয়ে বেশি মানুষ আজ শুক্রবার ঢাকা ছাড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দাদাবাড়িতে যেতে ভালো লাগে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকলেও দাদাবাড়ি যাওয়া হয়নি। এবার উত্তেজনা কাজ করছে
যাত্রাবাড়ী এলাকার পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শুভজিৎ রহমান

এবারের ঈদযাত্রায়ও অন্যান্যবারের মতো ভোগান্তি সঙ্গী হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। এআরআইয়ের তথ্য বলছে, ঈদের সময় দিনে যে ৩০ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়বেন, তার মধ্যে বাসে ৮ লাখ, ট্রেনে ১ লাখ, লঞ্চে দেড় লাখ, ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রায় ৪ লাখ এবং মোটরসাইকেলে প্রায় ৪ লাখ মানুষের পরিবহন সক্ষমতা রয়েছে। বাকি ১২ থেকে ১৩ লাখ মানুষকে ঢাকা ছাড়তে হবে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্রেনের ছাদ ও লঞ্চের অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে।

তবে ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, সড়কপথের যানজট, ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব, লঞ্চের উপচে পড়া ভিড়—যাত্রাপথের এসব ভোগান্তি ঈদযাত্রায় বাধা হতে পারে না। সারা বছর ঢাকায় থাকলেও ঈদের সময় আত্মীয়-পরিজনদের অপেক্ষাকে মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না। প্রিয়জনের কাছে ফেরার পর টিভিতে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ বেজে উঠতেই ভিন্ন রকম এক আনন্দানুভূতি ছুঁয়ে যায়।

সারা বছর যানবাহনের ভেঁপুর শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কয়েকটি দিনই তো শুধু পাখির ডাক শুনি।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আরিফুর রহমান

কারও কারও কাছে ঈদে বাড়ি ফেরা মানে এই শহর থেকে মুক্তি। বায়ুদূষণে ঢাকা রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। শব্দদূষণে এক নম্বর। দিনের বড় অংশ মানুষকে কাটাতে হয় যানজটে। এই শহরে সরু গলির ছোট ছোট বাসায় বাস করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ অন্তত কয়েকটি দিনের জন্য স্বস্তি পায় গ্রামে গিয়ে।

ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‘সারা বছর যানবাহনের ভেঁপুর শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কয়েকটি দিনই তো শুধু পাখির ডাক শুনি।’ তিনি বলেন, ‘ঈদে যদি পরিবার নিয়ে গ্রামে না যাই, তাহলে আমার সন্তান তার শিকড় চিনবে কী করে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন